৪০ কোটি টাকায় আধুনিক হচ্ছে লাকসাম-নোয়াখালী রেলপথ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬
  • ২ বার
৪০ কোটি টাকায় আধুনিক হচ্ছে লাকসাম-নোয়াখালী রেলপথ

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নোয়াখালী অঞ্চলের দীর্ঘদিনের রেল যোগাযোগ সমস্যার সমাধানে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। লাকসাম থেকে নোয়াখালী পর্যন্ত প্রায় ৪৮ থেকে ৫০ কিলোমিটার রেলপথ পুনর্বাসন ও আধুনিকায়নে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় ক্ষয়প্রাপ্ত রেললাইন সংস্কার, পুরোনো স্টিল স্লিপার পরিবর্তন, নতুন পাথর স্থাপন, রেললাইনের নিরাপত্তা জোরদার এবং ঝুঁকিপূর্ণ লেভেল ক্রসিংগুলোর উন্নয়ন করা হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম সম্প্রসারণ ও যাত্রীসেবার মান বাড়ানোর কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নোয়াখালী অঞ্চলের মানুষের রেলযাত্রা আরও নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও নির্ভরযোগ্য হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া ঢাকা-নোয়াখালী রুটে নতুন আন্তনগর ট্রেন ‘সুবর্ণচর এক্সপ্রেস’ চালুর পরিকল্পনাও সামনে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে নোয়াখালীর যাত্রীরা উন্নত রেল যোগাযোগের দাবি জানিয়ে আসছেন। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, ট্রেনের সংখ্যা বৃদ্ধি, যাত্রী ধারণক্ষমতা বাড়ানো এবং যাত্রাপথের অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়গুলো স্থানীয় মানুষের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, নোয়াখালীবাসীর যাতায়াতের সুবিধা বাড়াতে বন্ধ হয়ে যাওয়া ‘নোয়াখালী এক্সপ্রেস’ পুনরায় চালু এবং নতুন আন্তনগর ‘সুবর্ণচর এক্সপ্রেস’ পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সন্ধ্যায় নোয়াখালীর চৌমুহনী রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্ম সম্প্রসারণকাজ পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান তিনি। এ সময় বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী তানভীরুল ইসলাম, নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম, বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ কায়েসুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ও রেলওয়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী নেতারাও পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন।

পরিদর্শনকালে জনপ্রশাসন সচিব বলেন, নোয়াখালী ও চৌমুহনী অঞ্চলের কয়েকটি রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্ম তুলনামূলক ছোট হওয়ায় যাত্রীদের প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হয়। বিশেষ করে দীর্ঘ ট্রেন স্টেশনে প্রবেশ করলে সব যাত্রীর নিরাপদে ওঠানামার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা পাওয়া যায় না। নারী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং শারীরিকভাবে অসুবিধাগ্রস্ত যাত্রীদের জন্য এ পরিস্থিতি আরও বেশি সমস্যার সৃষ্টি করে। ট্রেনের অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের ভিড় এবং ওঠানামার সময় তাড়াহুড়ার কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও তৈরি হয়।

এই সমস্যা সমাধানে চৌমুহনী রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মের বিপরীত পাশে নতুন একটি অংশ সম্প্রসারণের কাজ শুরু হয়েছে। প্রস্তাবিত সম্প্রসারিত অংশটির দৈর্ঘ্য হবে ৩০০ ফুট এবং প্রস্থ ১৫ ফুট। কাজটি সম্পন্ন হলে একসঙ্গে ১৬টি কোচবিশিষ্ট ট্রেনের যাত্রীদের নিরাপদে ওঠানামার সুযোগ তৈরি হবে। ফলে স্টেশনে যাত্রীদের চাপ সামলানো সহজ হবে এবং ট্রেন চলাচলের সময় প্ল্যাটফর্মে বিশৃঙ্খলা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

শুধু প্ল্যাটফর্মের আয়তন বাড়ানোই নয়, স্টেশনটির সামগ্রিক পরিবেশ উন্নয়নের পরিকল্পনাও রয়েছে। প্ল্যাটফর্মের মেঝেতে পেভিংয়ের কাজ সম্পন্ন করা, অ্যাকসেস কন্ট্রোল ব্যবস্থার অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করা এবং স্টেশন ভবন ও শেডের সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কাজ বাস্তবায়িত হলে যাত্রীদের চলাচল আরও সুশৃঙ্খল হবে। পাশাপাশি স্টেশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন ও ব্যবহারবান্ধব করার সুযোগ তৈরি হবে।

নোয়াখালীর রেল যোগাযোগ উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলোর একটি হলো লাকসাম থেকে নোয়াখালী পর্যন্ত রেলপথ পুনর্বাসন। বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী তানভীরুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রায় ৪৮ থেকে ৫০ কিলোমিটার রেলপথ সংস্কারের জন্য প্রায় ৪০ কোটি টাকার একটি প্যাকেজের দরপত্র গত ৫ নভেম্বর আহ্বান করা হয়েছে। প্রকল্পটির আওতায় রেললাইনের বিভিন্ন দুর্বল ও ক্ষতিগ্রস্ত অংশ চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হবে।

দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে রেলপথের বিভিন্ন অংশে রেলপাত, স্লিপার ও অন্যান্য সংযোগ সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এসব ত্রুটি সময়মতো মেরামত না হলে ট্রেন চলাচলের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে প্রকল্পের আওতায় ক্ষয়প্রাপ্ত রেলপাত ও স্টিল স্লিপার পরিবর্তন, নতুন পাথর বা ব্যালাস্ট স্থাপন এবং রেললাইনের বিভিন্ন ফিটিংস আধুনিকায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি রেলপথের পাশে মাটি রক্ষার জন্য ব্যাংক প্রটেকশন ওয়াল নির্মাণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ লেভেল ক্রসিংগুলোর মানোন্নয়ন করা হবে।

বিশেষ করে লেভেল ক্রসিংয়ের নিরাপত্তা নোয়াখালী অঞ্চলের রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রেললাইন ও সড়কপথের সংযোগস্থলে যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকলে ট্রেন এবং সড়কযানের সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। স্থানীয় মানুষের চলাচল, যানবাহনের চাপ এবং রেলগাড়ির নিয়মিত যাতায়াতের বিষয় বিবেচনায় এসব স্থানের উন্নয়ন প্রয়োজন। প্রকল্পের আওতায় ঝুঁকিপূর্ণ লেভেল ক্রসিংগুলোর মানোন্নয়ন করা হলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা কমাতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে ঢাকা-নোয়াখালী রুটে নতুন আন্তনগর ট্রেন চালুর পরিকল্পনা থাকলেও আপাতত ইঞ্জিন সংকট বড় বাধা হয়ে রয়েছে। জনপ্রশাসন সচিবের বক্তব্য অনুযায়ী, মিটারগেজ ইঞ্জিনের পর্যাপ্ততা না থাকায় নতুন ট্রেন পরিচালনার উদ্যোগ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। তবে এ সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ রেলওয়ে নতুন লোকোমোটিভ কেনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

চট্টগ্রাম-দোহাজারী প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩০টি নতুন মিটারগেজ লোকোমোটিভ কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। প্রতিটি লোকোমোটিভের সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা। আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে এসব ইঞ্জিন এবং নতুন কোচ রেলওয়ের বহরে যুক্ত হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন সচিব। নতুন ইঞ্জিন যুক্ত হলে রেলওয়ের পরিচালন সক্ষমতা বাড়বে এবং বর্তমানে চলাচলকারী ট্রেনগুলোর সেবার মান উন্নত করার সুযোগ তৈরি হবে।

সচিবের আশা, নতুন লোকোমোটিভ ও কোচ বহরে যুক্ত হওয়ার পর উপকূল এক্সপ্রেসের বহর আধুনিকায়নের পাশাপাশি সুবর্ণচর এক্সপ্রেস চালুর প্রস্তুতিও সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। এর ফলে ঢাকা ও নোয়াখালীর মধ্যে রেল যোগাযোগ আরও সম্প্রসারিত হবে। বিশেষ করে কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, চাকরিপ্রার্থী এবং চিকিৎসার প্রয়োজনে রাজধানীতে যাতায়াতকারী সাধারণ মানুষ এর সুফল পেতে পারেন।

নোয়াখালী থেকে ঢাকায় যাতায়াতের ক্ষেত্রে সড়কপথের ওপর নির্ভরশীলতা অনেক বেশি। যানজট, সড়কের চাপ, যাত্রাপথে অনিশ্চয়তা এবং ভ্রমণ ব্যয়ের কারণে অনেক যাত্রী রেল যোগাযোগকে তুলনামূলক সুবিধাজনক বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করেন। পর্যাপ্ত ট্রেন ও উন্নত অবকাঠামো থাকলে যাত্রীদের যাতায়াতের বিকল্প বাড়বে। একই সঙ্গে নোয়াখালীর ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

চৌমুহনী নোয়াখালীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা। এ অঞ্চলের ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষের যাতায়াতের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও রেল যোগাযোগের গুরুত্ব রয়েছে। উন্নত রেলপথ এবং যাত্রীসেবার মান বাড়লে স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে রাজধানী ও অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হলে ব্যবসায়িক কার্যক্রম সম্প্রসারণের সুযোগ বাড়বে।

তবে প্রকল্পের ঘোষণা ও দরপত্র আহ্বানের পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে কাজ সম্পন্ন করা, কাজের মান নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ অব্যাহত রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। রেলপথ সংস্কারের সুফল দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে নির্মাণকাজে যথাযথ মান বজায় রাখার পাশাপাশি নিরাপত্তাব্যবস্থার নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। একইভাবে নতুন ট্রেন চালুর ক্ষেত্রে ইঞ্জিন ও কোচ সংগ্রহের পাশাপাশি জনবল, সময়সূচি এবং যাত্রীসেবার প্রস্তুতিও নিশ্চিত করতে হবে।

সব মিলিয়ে প্রায় ৪০ কোটি টাকার রেলপথ পুনর্বাসন প্রকল্প, চৌমুহনী স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম সম্প্রসারণ এবং ঢাকা-নোয়াখালী রুটে নতুন ট্রেন চালুর পরিকল্পনা নোয়াখালীর যোগাযোগব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে এসব পরিকল্পনার প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে বাস্তবায়নের গতি, কাজের মান এবং রেলওয়ের পরিচালন সক্ষমতার ওপর। দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ করে নোয়াখালীবাসীর জন্য নিরাপদ, আধুনিক ও স্বাচ্ছন্দ্যময় রেল যোগাযোগ নিশ্চিত করাই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com