মিরসরাইয়ে মিয়ানমারে পাচারের ১৫ টন সার জব্দ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬
  • ৫ বার
মিরসরাইয়ে মিয়ানমারে পাচারের ১৫ টন সার জব্দ

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বঙ্গোপসাগর ব্যবহার করে মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়ার সময় ১৫ টন ইউরিয়া সারসহ একটি ট্রাক জব্দ করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় ট্রাকচালক মেহেদী হাসান রোমনকে (২৫) আটক করা হয়েছে। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) দিবাগত রাত সাড়ে ১১টার দিকে মিরসরাইয়ের জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের কচ্ছপিয়া মোড়ে অভিযান চালিয়ে এসব সার উদ্ধার করা হয়। জব্দ করা সারের পরিমাণ ৩০০ বস্তা এবং এর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় চার লাখ টাকা। পুলিশ বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে বঙ্গোপসাগরকে ব্যবহার করে সার পাচারের একটি রুট হিসেবে মিরসরাইয়ের উপকূলীয় এলাকাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে পাচারকারীরা। এ কারণে ওই অঞ্চলে নজরদারি ও অভিযান জোরদার করা হয়েছে।

পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের কচ্ছপিয়া মোড়ে একটি অস্থায়ী চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়। জোরারগঞ্জ থানা পুলিশ এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলের শিল্প পুলিশের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এ অভিযানে সন্দেহজনক একটি ট্রাকের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল। একপর্যায়ে ঢাকা মেট্রো-ট-১৫-৮৫০১ নম্বরের ট্রাকটিকে থামিয়ে তল্লাশি চালানো হয়। এ সময় ট্রাকের ভেতর থেকে ৩০০ বস্তা ইউরিয়া সার পাওয়া যায়।

প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, সারগুলো নরসিংদীর ঘোড়াশাল এলাকা থেকে আনা হয়েছিল। তবে সেখান থেকে কীভাবে সারগুলো মিরসরাই পর্যন্ত পৌঁছেছে, পরিবহনের সঙ্গে আরও কারা জড়িত এবং শেষ পর্যন্ত কোন উপকূলীয় পথ ব্যবহার করে মিয়ানমারে পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ট্রাকচালককে আটক করার পাশাপাশি সারবোঝাই ট্রাকটি জব্দ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

জব্দ করা ৩০০ বস্তায় মোট ১৫ টন ইউরিয়া সার রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। প্রতিটি বস্তায় আনুমানিক ৫০ কেজি করে সার থাকায় মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ১৫ হাজার কেজি। উদ্ধার করা সারের বাজারমূল্য প্রায় চার লাখ টাকা বলে প্রাথমিকভাবে হিসাব করা হয়েছে। তবে এই মূল্যায়ন প্রাথমিক এবং তদন্তের প্রয়োজনে সারের প্রকৃত উৎস, সরবরাহসংক্রান্ত কাগজপত্র ও বাজারমূল্য যাচাই করা হতে পারে।

জোরারগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আব্দুল হালিম জানান, সাম্প্রতিক সময়ে মিরসরাইয়ের উপকূলীয় অঞ্চল ও বঙ্গোপসাগরকে সার পাচারের অন্যতম রুট হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে একটি চক্র। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ৩০০ বস্তা ইউরিয়া সারসহ ট্রাকটি জব্দ করা হয়েছে। এ ঘটনায় চালককে আটক করা হয়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।

তিনি আরও জানান, সারগুলো কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং কী উদ্দেশ্যে পরিবহন করা হচ্ছিল, তা তদন্তের বিষয়। পাচারচক্রের সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত থাকলে তাদের শনাক্ত করার চেষ্টা করা হবে। শুধু পরিবহনকারীকে আটক করেই তদন্ত শেষ করতে চায় না পুলিশ; বরং সারের সরবরাহব্যবস্থা ও সম্ভাব্য পাচার নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়েও অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।

জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের শিল্প পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ রাইসুল ইসলাম জানান, সাগরপথে পাচারের উদ্দেশ্যে সারবোঝাই একটি ট্রাক আটক করার পর বিষয়টি জোরারগঞ্জ থানার পুলিশকে জানানো হয়। পরে থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে সার ও ট্রাক জব্দ করে। যৌথ নজরদারি ও সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে এ ধরনের অবৈধ পরিবহন প্রতিরোধের চেষ্টা চলছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, একই এলাকায় এর আগেও সার পাচারের সন্দেহে অভিযান চালানো হয়েছিল। পুলিশ জানিয়েছে, এর আগে কচ্ছপিয়া মোড় এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৩০১ বস্তা ইউরিয়া সারসহ দুটি ট্রাক জব্দ করা হয়। একই এলাকায় অল্প সময়ের ব্যবধানে আবারও বিপুল পরিমাণ সার আটকের ঘটনা পাচার তৎপরতার সম্ভাব্য বিস্তৃতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। একাধিক ঘটনায় একই ধরনের পণ্য পরিবহনের বিষয়টি সামনে আসায় এর পেছনে সংগঠিত কোনো চক্র কাজ করছে কি না, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশে ইউরিয়া সার কৃষি উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপকরণ। ধানসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে নাইট্রোজেনসমৃদ্ধ এ সার ব্যবহার করা হয়। দেশের কৃষকদের জন্য সারের সরবরাহ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার বিভিন্ন সময়ে ভর্তুকি দিয়ে থাকে। ফলে কৃষকের কাছে নির্ধারিত দামে সার পৌঁছে দেওয়া এবং সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা কৃষি খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের সার অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হলে তার প্রভাব কৃষি সরবরাহব্যবস্থার ওপর পড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন, সেখানে অবৈধভাবে সার সরিয়ে নেওয়া হলে কৃত্রিম সংকট তৈরির আশঙ্কা দেখা দিতে পারে। এর ফলে কৃষকদের বেশি দামে সার কিনতে বাধ্য হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত কৃষিপণ্য ও সাধারণ ভোক্তার বাজারেও পড়তে পারে।

ইউরিয়া সারের মতো কৃষি উপকরণ পাচারের ক্ষেত্রে শুধু আর্থিক লাভের বিষয়টি নয়, জাতীয় কৃষি নিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িত। সরকার কৃষি উৎপাদন সচল রাখতে যে পরিমাণ অর্থ ভর্তুকি হিসেবে ব্যয় করে, সেই সুবিধা প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো অসাধু চক্র যদি কম দামে সংগ্রহ করা সার সীমান্ত বা সমুদ্রপথে অন্য দেশে পাঠানোর চেষ্টা করে, তাহলে সরকারি সহায়তার উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

মিরসরাইয়ের ভৌগোলিক অবস্থানও এ ধরনের ঘটনার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ। চট্টগ্রামের উপকূলীয় অঞ্চল হওয়ায় এ এলাকার সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। নৌপথে পণ্য পরিবহনের সুযোগ থাকায় বৈধ বাণিজ্যের পাশাপাশি অবৈধ পণ্য পরিবহনের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে স্থলপথে ট্রাকের মাধ্যমে পণ্য উপকূলীয় এলাকায় নিয়ে যাওয়ার পর সেগুলো নৌযানে স্থানান্তরের পরিকল্পনা করা হয়ে থাকলে তা শনাক্ত করতে সমন্বিত নজরদারি প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে শুধু সড়কে চেকপোস্ট বসানো যথেষ্ট নয়। উপকূলীয় নৌপথ, সন্দেহজনক নৌযান চলাচল, পণ্য ওঠানামার স্থান এবং পরিবহনসংক্রান্ত নথিপত্র যাচাইয়ের বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সারের উৎস ও বৈধ ক্রয়-বিক্রয়ের কাগজপত্র পরীক্ষা করলে সরবরাহব্যবস্থার কোথায় অনিয়ম হয়েছে, তা চিহ্নিত করা সহজ হতে পারে।

আটক ট্রাকচালক মেহেদী হাসান রোমনের ভূমিকা নিয়েও তদন্ত প্রয়োজন। তিনি নিজে পাচার পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, নাকি অন্য কারও নির্দেশে সার পরিবহন করছিলেন, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে সার সরবরাহকারী, পরিবহন ব্যবস্থাপক, সম্ভাব্য ক্রেতা এবং সমুদ্রপথে পণ্য গ্রহণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করা প্রয়োজন। কেবল চালককে আটক করার মধ্য দিয়ে যদি মূল চক্র অশনাক্ত থেকে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা আবারও ঘটতে পারে।

মিরসরাইয়ে ১৫ টন ইউরিয়া সার জব্দের ঘটনাটি তাই কেবল একটি ট্রাক আটকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে দেশের কৃষি উপকরণের সুষ্ঠু সরবরাহ, সরকারি ভর্তুকির সুরক্ষা এবং উপকূলীয় নিরাপত্তার বিষয়গুলোও জড়িত। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তে যদি পাচারের পরিকল্পনার সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে এর সঙ্গে জড়িত সব ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। পাশাপাশি দেশের কৃষকদের জন্য বরাদ্দকৃত সার যাতে কোনোভাবেই অবৈধ বাণিজ্যের হাতিয়ার হয়ে না ওঠে, সে বিষয়ে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com