প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের উপকূলীয় এলাকায় এক হৃদয়বিদারক বিমান দুর্ঘটনায় মেক্সিকো নৌবাহিনীর অন্তত দুই সদস্য নিহত হয়েছেন। মানবিক মিশনের অংশ হিসেবে পরিচালিত এই বিশেষ ফ্লাইটটি অবতরণের সময় বিধ্বস্ত হয়। মেক্সিকো নৌবাহিনী সোমবার এক বিবৃতিতে দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানায়, বিমানটিতে মোট আটজন আরোহী ছিলেন। দুর্ঘটনার পর চারজনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও দুইজন ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। নিখোঁজ থাকা বাকি দুইজনকে উদ্ধারে মার্কিন কোস্ট গার্ডের সঙ্গে যৌথভাবে তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান চালানো হচ্ছে।
দুর্ঘটনাটি ঘটে টেক্সাসের গালভেস্টন শহরের কাছে, শোলস ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট এলাকায় অবতরণের সময়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, বিমানটি অবতরণের প্রস্তুতিকালে হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উপকূলসংলগ্ন এলাকায় আছড়ে পড়ে। আছড়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিকট শব্দে বিস্ফোরণের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় এবং আশপাশের এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায় মার্কিন জরুরি সেবা সংস্থা, ফায়ার সার্ভিস ও কোস্ট গার্ডের উদ্ধারকারী দল।
মেক্সিকো নৌবাহিনীর বিবৃতিতে বলা হয়, এটি একটি বিশেষ মেডিকেল পরিবহন মিশন ছিল। ফ্লাইটটি মেক্সিকোর একটি স্বেচ্ছাসেবী ফাউন্ডেশনের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচালিত হচ্ছিল, যে ফাউন্ডেশনটি গুরুতর দাহজনিত আঘাতপ্রাপ্ত শিশুদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করে থাকে। এই মানবিক উদ্যোগের আওতায় শিশু রোগীদের চিকিৎসা সহায়তা, চিকিৎসক পরিবহন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম বহনের কাজ করা হয়। দুর্ঘটনাকবলিত বিমানটিও এমনই একটি মানবিক দায়িত্ব পালন করছিল।
মেক্সিকো নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিমানে থাকা আরোহীদের মধ্যে সামরিক সদস্যদের পাশাপাশি চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও ছিলেন। আহত ও উদ্ধার হওয়া চারজনকে দ্রুত নিকটবর্তী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁদের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল বলে প্রাথমিকভাবে জানানো হলেও মানসিকভাবে তাঁরা গভীর ট্রমার মধ্যে রয়েছেন। নিহতদের পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি, তবে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্নের পর স্বজনদের অবহিত করা হবে বলে জানিয়েছে মেক্সিকো নৌবাহিনী।
ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ফ্লাইট র্যাডারের তথ্য অনুযায়ী, বিমানটি মেক্সিকোর ইউকাটান অঙ্গরাজ্যের মেরিদা শহর থেকে ১৮:৪৬ জিএমটি সময়ে উড্ডয়ন করেছিল। নির্ধারিত রুট অনুসরণ করে এটি যুক্তরাষ্ট্রের আকাশসীমায় প্রবেশ করে এবং শেষবার ২১:০১ জিএমটি সময়ে গালভেস্টন বে এলাকায় শোলস ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের কাছাকাছি অবস্থান শনাক্ত করা হয়। এরপরই রাডার থেকে বিমানটির সংকেত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় দেশের উচ্চপর্যায়ের কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। মার্কিন কোস্ট গার্ড জানায়, নিখোঁজ দুইজনকে উদ্ধারে আকাশ ও নৌপথে একযোগে অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। উপকূলীয় জলসীমা, নিকটবর্তী দ্বীপাঞ্চল এবং সম্ভাব্য ধ্বংসাবশেষের এলাকায় তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে। আবহাওয়া পরিস্থিতি অনুসন্ধান অভিযানের জন্য কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হলেও উদ্ধারকাজ অব্যাহত রয়েছে।
এই দুর্ঘটনা আন্তর্জাতিক পরিসরে মানবিক মিশনের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে সামরিক বাহিনীর পরিচালিত মানবিক ফ্লাইটগুলোতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিমানটির কারিগরি ত্রুটি ছিল কি না, নাকি আবহাওয়াজনিত কোনো সমস্যার কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে—তা জানতে যৌথ তদন্ত শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে এক শোকবার্তায় নিহতদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়েছে এবং তাঁদের আত্মত্যাগকে মানবতার সেবায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের স্থানীয় প্রশাসনও দুর্ঘটনায় নিহতদের প্রতি শোক প্রকাশ করেছে এবং উদ্ধার অভিযানে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দেয়, মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের পেছনে কতটা ঝুঁকি ও আত্মত্যাগ জড়িয়ে থাকে। গুরুতর দাহজনিত আঘাতপ্রাপ্ত শিশুদের চিকিৎসার মতো সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিয়োজিত এই ফ্লাইটটি শেষ পর্যন্ত দুর্ঘটনার শিকার হলেও এর উদ্দেশ্য ছিল জীবন বাঁচানো। নিহতদের সেই মানবিক দায়বদ্ধতা ও দায়িত্ববোধ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হচ্ছে।
তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত কিছু বলা সম্ভব নয়। তবে মেক্সিকো নৌবাহিনী ও মার্কিন সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো আশাবাদী যে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদঘাটিত হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে। এদিকে নিখোঁজ দুইজনের সন্ধানে চলমান উদ্ধার অভিযান ঘিরে তাঁদের পরিবার ও সহকর্মীরা উৎকণ্ঠা ও আশার মধ্যে সময় পার করছেন।