প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতের বিহারে একটি সরকারি অনুষ্ঠানে সাম্প্রতিক এক ঘটনা আবারও দেশটির ক্ষমতাকাঠামোর ভেতরে প্রোথিত ইসলামবিদ্বেষকে প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার এক নবনিযুক্ত মুসলিম নারী চিকিৎসকের হিজাব প্রকাশ্যে টেনে খুলে দেন—যখন তিনি তাঁর নিয়োগপত্র গ্রহণ করতে মঞ্চে ওঠেন। মুহূর্তটি ক্যামেরায় ধরা পড়ে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাটি শুধু একজন ব্যক্তির মর্যাদাহানির বিষয় নয়; এটি ভারতের রাষ্ট্রীয় পরিসরে মুসলমানদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির প্রতীকী বহিঃপ্রকাশ হিসেবে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়।
একজন মুখ্যমন্ত্রীর কাছ থেকে এমন আচরণ কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক ঘটনা নয়—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বরং ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গত এক দশকে ভারতে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে যে ধারাবাহিক সহিংসতা ও বৈষম্য দেখা গেছে, এই ঘটনাটি তারই একটি দৃশ্যমান উদাহরণ। সময়ের সঙ্গে সহিংসতার ধরন বদলেছে, কিন্তু লক্ষ্যবস্তু হিসেবে মুসলমানরাই বারবার সামনে এসেছে।
ভারতের জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরো (এনসিআরবি) কিংবা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সামগ্রিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করলেও ধর্মভিত্তিক নিহতের পৃথক হিসাব নিয়মিতভাবে প্রকাশ করে না। ফলে সরকারি ডেটায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সহিংসতার প্রকৃত মাত্রা স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে না। মানবাধিকারকর্মীরা মনে করেন, এটি কেবল প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার ফল নয়; বরং রাজনৈতিক অনীহারও একটি বড় কারণ রয়েছে। ধর্মভিত্তিক তথ্য প্রকাশ হলে স্পষ্ট হয়ে উঠবে—কোন সম্প্রদায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা সেখানে কতটা ব্যর্থ।
সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে থাকে মানুষের জীবন। দাদরিতে মোহাম্মদ আখলাক, আলওয়ারে পেহলু খান কিংবা ঝাড়খণ্ডে তাবরেজ আনসারির নাম এখন আর শুধু ব্যক্তিগত পরিচয় নয়; তারা ভারতের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রতীক। গরুর মাংস খাওয়ার অভিযোগ, গুজব কিংবা সন্দেহের ভিত্তিতে যাদের পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় প্রায়শই দেখা গেছে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিচার দীর্ঘসূত্রতায় আটকে গেছে অথবা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তারা কার্যত দায়মুক্তি পেয়েছে।
স্বাধীন গবেষণা, সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে অন্তত ৭০ থেকে ৮০ জন মুসলমান সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন। এই সংখ্যা সরকারি নয় এবং সম্ভবত চূড়ান্তও নয়। বরং এটি রাষ্ট্রীয় নীরবতা, তথ্য গোপন এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির একটি আংশিক প্রতিফলন মাত্র। বহু ঘটনায় আহত, নিখোঁজ কিংবা বাস্তুচ্যুত মানুষের হিসাব তো আরও অস্পষ্ট।
এই এক দশকের অভিজ্ঞতায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংসতার কিছু সুস্পষ্ট প্যাটার্ন লক্ষ্য করা যায়। গরু জবাই বা গরুর মাংস পরিবহনের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত অজুহাতগুলোর একটি। পাশাপাশি ‘লাভ জিহাদ’ নামে বিতর্কিত ও প্রমাণহীন তত্ত্বকে কেন্দ্র করে মুসলিম পুরুষ ও হিন্দু নারীদের সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজব এবং উসকানিমূলক বক্তব্যও বহু সহিংসতার সূত্রপাত ঘটিয়েছে।
ধর্মীয় শোভাযাত্রার রুট বা সময় নিয়ে উত্তেজনা, মুসলিম ব্যবসায়ীদের বয়কটের ডাক এবং কিছু রাজনৈতিক নেতার প্রকাশ্য বিদ্বেষমূলক ভাষণ পরিস্থিতিকে আরও ঘনীভূত করেছে। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ দেরিতে হস্তক্ষেপ করেছে, কখনো পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করেছে, আবার কখনো ভুক্তভোগীদেরই অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ফলে ন্যায়বিচারের প্রতি মুসলিম সম্প্রদায়ের আস্থা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়েছে।
২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত গণপিটুনি একটি নতুন ও ভয়াবহ সামাজিক প্যাটার্ন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সময় দেখা গেছে, প্রথমে গুজব ছড়ানো হয়, এরপর সন্দেহভাজন ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয় শনাক্ত করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়। পরবর্তী সময়ে অভিযুক্তদের রাজনৈতিক আশ্রয় বা আইনি ছাড় পাওয়ার ঘটনাও কম নয়। এই পুনরাবৃত্ত চক্র সহিংসতাকে আরও উৎসাহিত করেছে বলে মনে করেন গবেষকরা।
এই সহিংসতার শিকারদের বড় অংশই ছিলেন সাধারণ মানুষ—বাজারে কাজ করা শ্রমিক, গ্রাম থেকে শহরে যাতায়াতকারী পথচারী কিংবা দরিদ্র কৃষক। তাদের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারকে শোকাহত করেনি; পুরো মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয়, অপমান ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি গভীর করেছে। অনেক পরিবার আজও বিচার পাওয়ার অপেক্ষায়।
এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যভিত্তিক কাশ্মিরী রাজনৈতিক কর্মী ও ওয়ার্ল্ড কাশ্মীর ফ্রিডম মুভমেন্টের সভাপতি এবং দ্য জাস্টিস ফাউন্ডেশন কাশ্মীর ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের পরিচালক ডা. মুজ্জাম্মিল আইয়ুব ঠাকুর বলেন, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা বোঝার জন্য দৃশ্যমান ঘটনার বাইরেও তাকাতে হবে। তাঁর মতে, ভারতের ক্ষমতাকাঠামোর ভেতরে বিজেপির মূল সংগঠন আরএসএস একটি গভীর প্রভাব বিস্তারকারী শক্তি হিসেবে কাজ করছে, যার আদর্শ ও কৌশল ইতিহাসের ফ্যাসিবাদী প্রবণতার সঙ্গে তুলনীয়। তিনি দাবি করেন, সংখ্যালঘুদের ক্ষতির বিনিময়ে এক সম্প্রসারণবাদী আদর্শ বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা দীর্ঘদিন ধরে চলছে।
তবে ভারতের সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকরা এসব অভিযোগকে অতিরঞ্জিত বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছে। তাদের বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা দিয়ে পুরো রাষ্ট্রকে দায়ী করা যায় না। কিন্তু মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, যখন একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটে এবং একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায় ধারাবাহিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন সেটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা কঠিন।
বিহারের সাম্প্রতিক হিজাব-সংক্রান্ত ঘটনাটি এই দীর্ঘ প্রেক্ষাপটেই নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। একজন মুখ্যমন্ত্রীর প্রকাশ্য আচরণ সমাজের নিচের স্তরে কী ধরনের বার্তা দেয়, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই। বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতার শীর্ষ থেকে যখন সংখ্যালঘুদের মর্যাদাহানির ইঙ্গিত আসে, তখন সহিংসতার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে।
সব মিলিয়ে, ২০১৫ থেকে ২০২৫—এই এক দশকে ভারতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংসতা আর কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনার সমষ্টি নয়; এটি একটি কাঠামোগত সংকটের রূপ নিয়েছে। তথ্যের স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষ বিচার এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয় বলেই মনে করছেন মানবাধিকারকর্মী ও বিশ্লেষকরা।