প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে উগ্রবিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে, যা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে অস্থিরতার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) এবং বজরং দলের ডাকে মঙ্গলবার শুরু হওয়া বিক্ষোভে কয়েক শত বিক্ষোভকারী উপস্থিত ছিলেন। তারা হাইকমিশনের নিরাপত্তা ব্যারিকেড ভেঙে কূটনৈতিক এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত নিরাপত্তা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তৎপর হয়েছে এবং হাইকমিশনের চারপাশে তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে।
বিক্ষোভের মূল কারণ হিসেবে বাংলাদেশের ময়মনসিংহে দিপু চন্দ্র দাস নামে এক হিন্দু যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা এবং সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে স্লোগান দেন, যাতে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও বিচার দাবি করা হয়। এটি শুধু নয়াদিল্লি নয়, বরং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কট হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর আগে ২০ ডিসেম্বর রাতে হাইকমিশনের সামনে একটি ছোট বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তখন জানিয়েছিল, সেখানে মাত্র ২০–২৫ জন বিক্ষোভকারী উপস্থিত ছিলেন এবং তারা কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি করেনি। তবে বাংলাদেশ এই দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, নয়াদিল্লির হাইকমিশন একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল কূটনৈতিক এলাকা, তাই অনুমতি ছাড়া সেখানে বিক্ষোভ করা স্বাভাবিক নয়। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, কীভাবে উগ্র সংগঠনের সদস্যরা অনুমতি ছাড়া হাইকমিশনের ভিতরে প্রবেশ করতে সক্ষম হলো।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্রুত এই ঘটনার পর ভারতের পররাষ্ট্র দফতরকে স্মারকলিপি পাঠিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কূটনৈতিক স্থাপনা ও কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। হাইকমিশনে অনিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নিন্দা জানানো হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ধরনের ঘটনা শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক পরিবেশকেই প্রভাবিত করতে পারে। নয়াদিল্লি ও ঢাকার মধ্যে চলমান কূটনৈতিক সম্পর্ককে অটল রাখতে উভয় দেশের পক্ষেই দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে হাইকমিশনের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ নিশ্চিত করতে ভারতের দায়িত্ব রয়েছে।
বিক্ষোভ চলাকালীন সময়ে হাইকমিশনের কর্মকর্তা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা তৎপর থাকলেও, উগ্র বিক্ষোভকারীদের তৎপরতা এবং ব্যারিকেড ভাঙার ঘটনা প্রশাসনকে সতর্ক করেছে। ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে ভারতীয় দফতরের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের মাধ্যমে এই ঘটনার বিষয়ে স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া জানাবে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এবং বজরং দলের মতো উগ্র সংগঠনগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা পুনরায় ঘটতে পারে। কূটনৈতিক স্থাপনা ও কনস্যুলেটের নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। হাইকমিশনের চারপাশে তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয় থাকা সত্ত্বেও বিক্ষোভকারীদের ব্যারিকেড ভাঙার ঘটনা উদ্বেগজনক।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, “এই ধরনের ঘটনা শুধু কূটনৈতিক মর্যাদা নষ্ট করে না, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমরা আশা করি, ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত পরিস্থিতি স্থিতিশীল হবে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।”
বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের নিরাপত্তা, হত্যা ও সহিংসতা প্রতিরোধের জন্য ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি তারা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নীতিমালায় হস্তক্ষেপ না করার জন্যও চিঠি পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে।
এই ঘটনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরও ঘুরে এসেছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ধরনের ঘটনা দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ককে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে। তাই উভয় দেশের জন্য সংবেদনশীল এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশ হাইকমিশনের এই বিক্ষোভ ঘটনাটি দেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ও সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি শুধু নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনকেই তুলে ধরেছে, বরং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংবেদনশীলতা নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বকেও প্রতিফলিত করেছে।