প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের কারাক জেলায় পুলিশের একটি মোবাইল ভ্যানে বন্দুকধারীদের হামলায় কমপক্ষে পাঁচ পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। দেশটিতে চলমান নিরাপত্তা সংকটের মধ্যে এই হামলা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। মঙ্গলবার (২৩ ডিসেম্বর) সকালে সংঘটিত এই ঘটনায় নিহত পাঁচ পুলিশ সদস্যকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘শহীদ’ ঘোষণা করা হয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।
কারাক জেলার পুলিশ কর্মকর্তা (ডিপিও) সৌদ খান জানান, মঙ্গলবার সকালে একটি বেসরকারি গ্যাস কোম্পানির নিরাপত্তা দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশের একটি মোবাইল ভ্যান নির্ধারিত রুটে টহল দিচ্ছিল। এ সময় পূর্বপরিকল্পিতভাবে ওত পেতে থাকা সশস্ত্র বন্দুকধারীরা হঠাৎ করে ভ্যানটিকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। আকস্মিক এই হামলায় ভ্যানে থাকা পাঁচ পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলেই গুরুতর আহত হন। পরে তাদের সকলেই নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করা হয়।
ডিপিও সৌদ খান আরও জানান, হামলার পর সন্ত্রাসীরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায় এবং যাওয়ার আগে পুলিশের মোবাইল ভ্যানটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে গাড়িটি সম্পূর্ণভাবে পুড়ে যায়। ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ ও উদ্ধারকারী দল আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে এবং নিহত পুলিশ সদস্যদের মরদেহ উদ্ধার করে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হামলার এলাকাটি খাইবার পাখতুনখোয়ার একটি সংবেদনশীল অঞ্চল হিসেবে পরিচিত, যেখানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সন্ত্রাসী কার্যক্রমের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। বিশেষ করে শিল্প ও জ্বালানি প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে আগেও হামলার ঘটনা ঘটেছে।
এই মর্মান্তিক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ। এক শোকবার্তায় তিনি নিহত পুলিশ সদস্যদের শাহাদাতের জন্য গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং তাদের পরিবার-পরিজনের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাকিস্তান পুলিশ বাহিনী সম্মুখ সারিতে থেকে অসামান্য সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে। তিনি এই আত্মত্যাগকে জাতি কখনো ভুলবে না বলেও উল্লেখ করেন।
শেহবাজ শরীফ আরও বলেন, সন্ত্রাসীরা পাকিস্তানের শান্তি ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে চাইলেও সরকার তাদের এই অপচেষ্টা সফল হতে দেবে না। তিনি দেশ থেকে সব ধরনের সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করার ব্যাপারে সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হামলাকারীদের দ্রুত চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনার নির্দেশ দেন।
খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফরিদিও এই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি এক বিবৃতিতে হামলাকে ‘অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয়’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এই ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড প্রদেশের শান্তি ও উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে চালানো হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী আশ্বাস দেন, হামলার পেছনে যারা রয়েছে তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না এবং দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।
এদিকে, ঘটনার পর কারাক জেলাসহ আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সম্ভাব্য সন্দেহভাজনদের ধরতে তল্লাশি অভিযান শুরু করেছে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং বিভিন্ন প্রবেশপথে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতা দখলের পর থেকে পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী প্রদেশগুলোতে সন্ত্রাসী তৎপরতা নতুন করে বেড়েছে। বিশেষ করে খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তান প্রদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে লক্ষ্য করে হামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব হামলার পেছনে বিভিন্ন উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি ও অবকাঠামো প্রকল্পে নিয়োজিত নিরাপত্তা বাহিনী সন্ত্রাসীদের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। কারণ এসব প্রকল্পে হামলা চালিয়ে তারা রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও বিনিয়োগ পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চায়।
কারাকের এই হামলা পাকিস্তানে পুলিশের নিরাপত্তা ঝুঁকি ও সন্ত্রাসবিরোধী কৌশল নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। একদিকে যখন সরকার সন্ত্রাস দমনের দাবি করছে, অন্যদিকে এমন রক্তক্ষয়ী হামলা সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বাড়াচ্ছে।
নিহত পুলিশ সদস্যদের দাফনের প্রস্তুতি চলছে এবং রাষ্ট্রীয় সম্মানের সঙ্গে তাদের শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। শোকাহত পরিবারগুলোর জন্য সরকারি সহায়তা ও ক্ষতিপূরণের ঘোষণাও আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই হামলার মাধ্যমে আবারও স্পষ্ট হলো, সন্ত্রাসবাদ পাকিস্তানের জন্য এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দেশটির শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের পথে এই সহিংসতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, আর তা মোকাবিলায় কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপের বিকল্প নেই।