৮৭৫ বার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনে ৪১১ ফিলিস্তিনি নিহত: গাজা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ১৫ বার

প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ফিলিস্তিনি হত্যা গাজায় নতুন করে মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি করেছে। চলতি বছরের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি হামলায় অন্তত ৪১১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং আরও ১,১১২ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস। সোমবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সংস্থাটি দাবি করেছে, এই সময়ের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তির মোট ৮৭৫টি লঙ্ঘনের ঘটনা তারা নথিভুক্ত করেছে, যা যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় ইসরাইলি সামরিক কার্যক্রম থেমে থাকেনি। বরং বিভিন্নভাবে হামলা, অনুপ্রবেশ ও গোলাবর্ষণের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। গাজার মিডিয়া অফিসের তথ্যমতে, লঙ্ঘনের মধ্যে রয়েছে বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে সরাসরি গুলিবর্ষণের অন্তত ২৬৫টি ঘটনা, আবাসিক এলাকায় ৪৯টি সামরিক অনুপ্রবেশ, ৪২১টি গোলাবর্ষণ এবং প্রায় ১৫০টি বাড়িঘর ধ্বংসের ঘটনা। এসব হামলায় নারী ও শিশুসহ অসংখ্য সাধারণ মানুষ হতাহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়।

গাজার বাসিন্দারা বলছেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার ঘোষণার পর তারা স্বস্তির আশা করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি খুব একটা বদলায়নি। অনেক এলাকায় রাতের বেলায় গুলির শব্দ, ড্রোনের ওড়াউড়ি এবং হঠাৎ গোলাবর্ষণ মানুষের মধ্যে স্থায়ী আতঙ্ক তৈরি করেছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে চালানো হামলার ফলে ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে।

গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যুদ্ধবিরতির আওতায় ইসরাইলের মানবিক দায়বদ্ধতাও পূরণ করা হয়নি। চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গাজায় বিপুল পরিমাণ ত্রাণ ও জ্বালানি প্রবেশের কথা থাকলেও বাস্তবে তার খুব সামান্য অংশই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, যেখানে ৪২,৮০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশ করার কথা ছিল, সেখানে এখন পর্যন্ত মাত্র ১৭,৮১৯টি ট্রাক গাজায় ঢুকেছে। এর ফলে দৈনিক গড়ে ২৪৪টি ট্রাক প্রবেশ করেছে, যা নির্ধারিত দৈনিক ৬০০ ট্রাকের তুলনায় অনেক কম।

এই পরিস্থিতিকে যুদ্ধবিরতি চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়েছে গাজার মিডিয়া অফিস। সংস্থাটির দাবি, চুক্তি বাস্তবায়নের হার মাত্র ৪১ শতাংশে সীমাবদ্ধ রয়েছে, যা গাজার মানুষের ন্যূনতম মানবিক চাহিদা পূরণে সম্পূর্ণ অপ্রতুল। ত্রাণের ঘাটতির কারণে খাদ্য, ওষুধ ও জরুরি সামগ্রীর সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে।

জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে বিবৃতিতে। যুদ্ধবিরতির আওতায় যেখানে ৩,৬৫০টি জ্বালানি বহনকারী ট্রাক গাজায় প্রবেশের কথা ছিল, সেখানে অনুমতি পেয়েছে মাত্র ৩৯৪টি। অর্থাৎ দৈনিক গড়ে মাত্র পাঁচটি ট্রাক ঢুকেছে, যেখানে চুক্তি অনুযায়ী প্রতিদিন অন্তত ৫০টি ট্রাক প্রবেশের কথা ছিল। এর ফলে জ্বালানি সরবরাহের মাত্র ১০ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

জ্বালানির এই সংকট গাজার জীবনযাত্রাকে কার্যত অচল করে দিয়েছে বলে জানিয়েছে গাজার মিডিয়া অফিস। হাসপাতালগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি না থাকায় চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক হাসপাতাল জরুরি অস্ত্রোপচার সীমিত করতে বাধ্য হয়েছে। বেকারি, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাও জ্বালানি সংকটের কারণে প্রায় অচল হয়ে পড়েছে, যার ফলে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে।

বিবৃতিতে গাজায় “গভীর ও নজিরবিহীন মানবিক সংকট”-এর কথা উল্লেখ করা হয়। গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস অভিযোগ করেছে, ইসরাইল সীমান্ত ক্রসিং খুলতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে এবং তাঁবু, অস্থায়ী ঘর, ক্যারাভানসহ আশ্রয় সামগ্রী প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী এসব সামগ্রী প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। সংস্থাটি এসব পদক্ষেপকে যুদ্ধবিরতি চুক্তি ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের “স্পষ্ট লঙ্ঘন” হিসেবে বর্ণনা করেছে।

এ ছাড়া সাম্প্রতিক শীতকালীন ঝড়ে গাজায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কথাও উল্লেখ করা হয়। গাজার মিডিয়া অফিস জানায়, শীতকালীন ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত অন্তত ৪৬টি ভবন ধসে পড়েছে। এসব ঘটনায় কমপক্ষে ১৫ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়। সংস্থাটির অভিযোগ, আশ্রয় সামগ্রী প্রবেশে বাধা এবং অবকাঠামো পুনর্গঠনে নিষেধাজ্ঞার কারণেই এসব ভবন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও এ ধরনের সহিংসতা ও মানবিক অবরোধ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের গুরুতর লঙ্ঘন। তারা বলছে, বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো এবং ত্রাণ প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করা যুদ্ধাপরাধের শামিল হতে পারে।

গাজার মিডিয়া অফিস মধ্যস্থতাকারী দেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছে। তারা বলেছে, অবিলম্বে নিরাপদভাবে ত্রাণ ও জ্বালানি প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী আশ্রয় সামগ্রী গাজায় প্রবেশের অনুমতি দিতে হবে। সংস্থাটির মতে, এসব পদক্ষেপ ছাড়া গাজায় ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে ওঠা মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত