প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মিয়ানমারে সামরিক জান্তার আয়োজিত আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ভয়াবহ মানবাধিকার সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। ভোটকে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে চাইলেও বাস্তবে সাধারণ মানুষ পড়েছে দুই পক্ষের চরম চাপ, হুমকি ও সহিংসতার মুখে। একদিকে সামরিক কর্তৃপক্ষ জনগণকে ভোট দিতে বাধ্য করতে চালাচ্ছে নৃশংসতা ও ভয়ভীতি, অন্যদিকে সশস্ত্র বিরোধী গোষ্ঠীগুলো ভোটে অংশগ্রহণ ঠেকাতে ব্যবহার করছে একই ধরনের দমনমূলক কৌশল। এই দ্বিমুখী সন্ত্রাসে সাধারণ মানুষের জীবন, নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক সম্প্রতি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, মিয়ানমারের সামরিক জান্তা নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে জনগণের বিরুদ্ধে চরম সহিংসতা চালাচ্ছে। তিনি বলেন, ভোট দিতে বাধ্য করার নামে মানুষকে গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও দীর্ঘমেয়াদি সাজা দেওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। একই সঙ্গে তিনি সামরিক কর্তৃপক্ষকে ভিন্নমত দমনের নামে নির্বিচার আটক ও নিপীড়ন বন্ধের আহ্বান জানান।
আগামী রোববার থেকে মিয়ানমারে ধাপে ধাপে ভোট আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে জান্তা সরকার। পাঁচ বছর আগে নির্বাচিত বেসামরিক সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখলের পর দেশটি গৃহযুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে নিমজ্জিত রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন, লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে। এমন বাস্তবতায় সামরিক শাসকেরা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত এই নির্বাচনকে ‘গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন’ হিসেবে প্রচার করলেও আন্তর্জাতিক মহল একে প্রত্যাখ্যান করেছে।
সাবেক বেসামরিক নেত্রী ও নোবেল বিজয়ী অং সান সু চি এখনও কারাগারে বন্দী। তার জনপ্রিয় দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি কার্যত ভেঙে দেওয়া হয়েছে। বিরোধী কণ্ঠ দমন, রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধকরণ এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর কড়াকড়ি আরোপের মধ্য দিয়ে যে নির্বাচন আয়োজন করা হচ্ছে, তা গণতান্ত্রিক মানদণ্ড পূরণ করে না বলে মত দিয়েছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।
ভলকার তুর্ক এর আগেই বলেছিলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মিয়ানমারে নির্বাচন আয়োজন ‘অকল্পনীয়’। মঙ্গলবার দেওয়া সর্বশেষ সতর্কবার্তায় তিনি জানান, সাধারণ মানুষ এখন সামরিক কর্তৃপক্ষ ও সশস্ত্র বিরোধী গোষ্ঠী—উভয়ের কাছ থেকেই ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়ছে। ‘নির্বাচন সুরক্ষা আইন’-এর আওতায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রয়োগের অভিযোগে বহু মানুষকে আটক করা হয়েছে। অনেকের বিরুদ্ধে এমন সব মামলা দেওয়া হয়েছে, যার শাস্তি অস্বাভাবিকভাবে কঠোর।
ইয়াঙ্গুন অঞ্চলের হ্লাইংহায়া টাউনশিপের ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতার একটি দৃষ্টান্ত। সেখানে নির্বাচনবিরোধী পোস্টার টাঙানোর অভিযোগে তিন যুবককে ৪২ থেকে ৪৯ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, এ ধরনের সাজা শুধুই ভীতি ছড়ানোর কৌশল, যাতে মানুষ মুখ খুলতে না পারে এবং ভোটে অংশ নিতে বাধ্য হয়।
জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয় জানিয়েছে, ম্যান্ডালে অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষের কাছ থেকে তারা উদ্বেগজনক তথ্য পেয়েছে। এসব মানুষকে হুমকি দেওয়া হয়েছে—ভোট না দিলে তাদের ওপর হামলা চালানো হবে কিংবা বাড়িঘর দখল করে নেওয়া হবে। বাস্তুচ্যুত মানুষদের অনেকেই ইতোমধ্যে সহিংসতা থেকে বাঁচতে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন। সেই মানুষদের আবার অনিরাপদ অবস্থায় ভোট দিতে বাধ্য করা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল বলে মন্তব্য করেছেন ভলকার তুর্ক।
অন্যদিকে সামরিক বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর দিক থেকেও সাধারণ মানুষ ‘মারাত্মক হুমকির’ মুখে পড়ছে। ভোট প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের টার্গেট করে অপহরণ ও ভয় দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। গত মাসে কিয়াইকতো থেকে নয়জন নারী শিক্ষককে অপহরণ করা হয়, যখন তারা ব্যালট সংক্রান্ত প্রশিক্ষণে অংশ নিতে যাচ্ছিলেন। পরে তাদের মুক্তি দেওয়া হলেও অপহরণকারীদের পক্ষ থেকে সতর্ক বার্তা দেওয়া হয়, যাতে তারা ভবিষ্যতে নির্বাচন কার্যক্রমে যুক্ত না হন।
ভলকার তুর্ক বলেছেন, এই নির্বাচন এমন এক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যেখানে স্বাধীন মতপ্রকাশ, সংগঠন গঠন কিংবা শান্তিপূর্ণ সমাবেশের কোনো সুযোগ নেই। সহিংসতা ও দমন-পীড়নের ছায়ায় হওয়া এ নির্বাচন জনগণের প্রকৃত ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে পারবে না। বরং এটি সামরিক শাসনকে নতুন মোড়কে বৈধতা দেওয়ার প্রচেষ্টা মাত্র।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মিয়ানমারের এই তথাকথিত নির্বাচন দেশটির দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কোনো সমাধান আনবে না। বরং সহিংসতা আরও বাড়তে পারে এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ দীর্ঘায়িত হতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ ও কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয় বলেও মত দিয়েছেন তারা।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো এখন আন্তর্জাতিক মহলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, যেন তারা মিয়ানমারের জনগণের পাশে দাঁড়ায় এবং সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়। নতুবা ভয় ও দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে আয়োজিত এই নির্বাচন মিয়ানমারের ইতিহাসে আরেকটি অন্ধকার অধ্যায় হিসেবেই থেকে যাবে।