দীর্ঘমেয়াদে গাজা দখলে রাখার ইঙ্গিত, ইসরাইলের কঠোর বার্তা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৭৮ বার
দীর্ঘমেয়াদে গাজা দখলে রাখার ইঙ্গিত, ইসরাইলের কঠোর বার্তা

প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গাজা উপত্যকা থেকে ইসরাইলি সেনাবাহিনী কখনোই সরে যাবে না—এমন স্পষ্ট ও কঠোর বার্তা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছেন ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ। চলমান যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় পর্যায় নিয়ে যখন মধ্যস্থতাকারীদের উদ্যোগে আলোচনা এগোচ্ছে, ঠিক সেই সময় তার এই মন্তব্যকে আন্তর্জাতিক মহল গাজা দখল দীর্ঘমেয়াদি করার প্রকাশ্য ইঙ্গিত হিসেবেই দেখছে।

মঙ্গলবার ইসরাইলের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্যে কাৎজ বলেন, গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি সেনারা অবস্থান করছে এবং ভবিষ্যতেও তারা সেখান থেকে সরে যাবে না। শুধু তাই নয়, তিনি উত্তর গাজায় স্থায়ী সামরিক ফাঁড়ি স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন। তার এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র, কাতার ও মিসরের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ধাপ বাস্তবায়নের জন্য চাপ বাড়ছে, যার অন্যতম শর্ত হচ্ছে গাজা থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার।

অধিকৃত পশ্চিম তীরের বেইত এল এলাকায় অবৈধ ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে কাৎজ বলেন, ‘আমরা গাজার ভেতরে আছি এবং আমরা কখনই এই উপত্যকা ছেড়ে যাব না। এমন কিছু ঘটবে না।’ তার বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল, গাজাকে ইসরাইলের সামরিক কৌশলের স্থায়ী অংশ হিসেবেই দেখছে বর্তমান সরকার।

বাংলাদেশের বড় দুশ্চিন্তা ব্যাটিং

প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমরা গাজায় রয়েছি ইসরাইলকে রক্ষা করার জন্য। অতীতে যা ঘটেছে, তা যেন আর কখনো না ঘটে, সেটি নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।’ এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি ৭ অক্টোবরের হামলার প্রসঙ্গ টেনে এনে গাজায় সামরিক উপস্থিতিকে আত্মরক্ষার যুক্তিতে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন।

কাৎজের বক্তব্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো উত্তর গাজায় স্থায়ী ফাঁড়ি স্থাপনের ঘোষণা। তিনি বলেন, ‘যখন সময় আসবে, আমরা উত্তর গাজায় ফাঁড়ি স্থাপন করব। আমরা সঠিক উপায়ে এবং উপযুক্ত সময়ে এটি করব।’ বিশ্লেষকদের মতে, এটি কার্যত গাজা উপত্যকাকে দীর্ঘ সময়ের জন্য সামরিক নিয়ন্ত্রণে রাখার একটি রূপরেখা, যা আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের প্রস্তাবগুলোর সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

এই ঘোষণার তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে ইসরাইলের ভেতর থেকেই। সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও ইসরাইলি সেনাবাহিনীর সাবেক চিফ অব স্টাফ গাদি আইজেনকোট কাৎজের বক্তব্যকে দায়িত্বজ্ঞানহীন ও বিপজ্জনক বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, এমন এক সংকটময় সময়ে সরকার জাতীয় নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে বিস্তৃত জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলার পরিবর্তে বিভাজন সৃষ্টি করছে। তার মতে, গাজা নিয়ে এমন একতরফা ও কট্টর অবস্থান ইসরাইলকে আন্তর্জাতিকভাবে আরও একঘরে করে ফেলবে।

আন্তর্জাতিক পরিসরেও কাৎজের বক্তব্য গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা দীর্ঘদিন ধরেই গাজাকে কার্যত ‘খোলা কারাগার’ বলে বর্ণনা করে আসছে। টানা সামরিক অভিযান, অবরোধ, খাদ্য ও চিকিৎসা সংকটে গাজার সাধারণ মানুষ মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছে। এমন বাস্তবতায় গাজা ছাড়বে না—এই ঘোষণা সেখানে বসবাসরত লাখো ফিলিস্তিনির ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।

চলমান যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়ন নিয়ে মধ্যস্থতাকারীরা যে প্রস্তাবগুলো সামনে এনেছেন, তার মধ্যে রয়েছে গাজা থেকে ধাপে ধাপে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার, হামাসের পরিবর্তে একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনিক কাঠামো গঠন এবং একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েন। এই পরিকল্পনার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সময়কার প্রস্তাবের প্রভাবও রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে কাৎজের বক্তব্য স্পষ্ট করে দিয়েছে, বর্তমান ইসরাইল সরকার সেই পথে হাঁটতে আগ্রহী নয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গাজা নিয়ে ইসরাইলের এই অবস্থান শুধু ফিলিস্তিন-ইসরাইল সংঘাতকেই দীর্ঘায়িত করবে না, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন করে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। যুদ্ধবিরতির আলোচনা ভেঙে পড়লে আবারও পূর্ণমাত্রার সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে গাজার সাধারণ মানুষ, যারা ইতোমধ্যে প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি ও অবর্ণনীয় মানবিক সংকটের শিকার।

ফিলিস্তিনি পক্ষ থেকে কাৎজের বক্তব্যকে আগ্রাসী দখলদারিত্বের প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। তারা বলছে, গাজায় ইসরাইলি সামরিক উপস্থিতি অব্যাহত রাখা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন এবং এটি শান্তি প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করবে। হামাসসহ বিভিন্ন ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী সতর্ক করে জানিয়েছে, গাজা দখল দীর্ঘমেয়াদি করার চেষ্টা করলে প্রতিরোধ আরও তীব্র হবে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর কূটনৈতিক মহলে কাৎজের বক্তব্য নিয়ে অস্বস্তি বাড়ছে। প্রকাশ্যে কেউ কেউ এখনো নীরব থাকলেও, কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি যুদ্ধবিরতির টেকসই ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য। সেই জায়গায় ইসরাইলের এমন অনমনীয় অবস্থান আলোচনাকে কঠিন করে তুলছে।

গাজার বাস্তবতা আজ ভয়াবহ। হাজার হাজার মানুষ নিহত, লক্ষাধিক বাস্তুচ্যুত, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে ঘরবাড়ি, হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বিদ্যুৎ, পানি ও খাদ্যের সংকটে মানবিক পরিস্থিতি চরমে। এই অবস্থায় দখলদারিত্ব দীর্ঘায়িত করার ঘোষণা গাজার মানুষের জন্য আরও অন্ধকার ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সব মিলিয়ে ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য শুধু একটি রাজনৈতিক ঘোষণা নয়, বরং এটি গাজা উপত্যকার ভবিষ্যৎ, যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। যুদ্ধবিরতি আলোচনার টেবিলে যেখানে প্রত্যাশা ছিল উত্তেজনা কমানোর, সেখানে কাৎজের ঘোষণায় সংঘাতের ছায়াই যেন আরও গাঢ় হয়ে উঠল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত