প্রকাশ: ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
অধিকৃত পশ্চিম তীরে নতুন করে ১৯টি অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনের অনুমোদন দেওয়ায় ইসরাইলের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার ১৪টি প্রভাবশালী দেশ। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডা, জার্মানি ও ইতালিসহ এসব দেশ এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, ইসরাইলের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে এবং গাজায় সদ্য প্রতিষ্ঠিত ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলছে। একই সঙ্গে এটি মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি, নিরাপত্তা ও দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনাকেও দুর্বল করে দিচ্ছে।
আল জাজিরাসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ইসরাইলি নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ১৯টি নতুন বসতি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে, যখন আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীরা গাজা যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় পর্যায় বাস্তবায়নের জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। ফলে ইউরোপীয় দেশগুলোর মতে, বসতি সম্প্রসারণের এই উদ্যোগ শুধু রাজনৈতিক উসকানি নয়, বরং চলমান শান্তি প্রচেষ্টার ওপর সরাসরি আঘাত।
যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো হলো বেলজিয়াম, কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, আইসল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, জাপান, মাল্টা, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, স্পেন ও যুক্তরাজ্য। বিবৃতিতে তারা স্পষ্ট ভাষায় জানায়, ইসরাইলি নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার এই সিদ্ধান্ত অবৈধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। একই সঙ্গে এটি ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ক্ষুণ্ন করছে এবং ভবিষ্যতে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বসতি স্থাপন ও দখলদারিত্বের নীতির বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান আগের মতোই দৃঢ় ও অপরিবর্তিত। যেকোনো ধরনের সংযুক্তি কিংবা বসতি সম্প্রসারণ আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ায় এবং সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী করে। এ কারণে তারা ইসরাইলকে অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনি জনগণের মৌলিক অধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি তাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে দেশগুলো।
ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতের প্রেক্ষাপটে পশ্চিম তীরের বসতি প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরেই সবচেয়ে বিতর্কিত ও সংবেদনশীল ইস্যুগুলোর একটি। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, অধিকৃত ভূখণ্ডে দখলদার শক্তির বসতি স্থাপন অবৈধ। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় একটি অংশ পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতিকে অবৈধ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। তবুও বিগত কয়েক দশকে বসতি সম্প্রসারণ থেমে থাকেনি; বরং বিভিন্ন ইসরাইলি সরকারের আমলে তা আরও বিস্তৃত হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় দেশগুলোর যৌথ বিবৃতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ, একসঙ্গে ১৪টি দেশ প্রকাশ্যে ইসরাইলের সিদ্ধান্তের নিন্দা জানানো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি শক্ত বার্তা দেয়। বিশেষ করে যখন গাজায় যুদ্ধবিরতির পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হওয়ার আশা তৈরি হয়েছিল, তখন পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ নতুন করে উত্তেজনা বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।
ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে আলোচনা চলছে। রোববার দেশটির কট্টর-ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ প্রকাশ্যে জানান, বসতি স্থাপন পরিকল্পনার প্রতি সবুজ সংকেত দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই সিদ্ধান্তের অন্যতম লক্ষ্য হলো ভবিষ্যতে একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ রুদ্ধ করা। তার এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। অনেকের মতে, এটি শুধু বসতি সম্প্রসারণ নয়, বরং দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানকে কার্যত অস্বীকার করার একটি রাজনৈতিক ঘোষণা।
ফিলিস্তিনি নেতারা বরাবরই বলে আসছেন, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ তাদের ভূখণ্ডকে খণ্ড-বিখণ্ড করে দিচ্ছে এবং একটি কার্যকর ও স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনাকে ধ্বংস করছে। ইউরোপীয় দেশগুলোর বিবৃতিতেও এই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যায়। তারা মনে করছে, বসতি সম্প্রসারণ চলতে থাকলে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান কেবল কাগুজে ধারণায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।
এদিকে গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত নাজুক। মধ্যস্থতাকারীরা যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নের চেষ্টা চালাচ্ছেন, যেখানে স্থায়ী শান্তির রূপরেখা এবং বন্দি বিনিময়ের মতো বিষয়গুলো আলোচনায় রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পশ্চিম তীরে বসতি অনুমোদনের সিদ্ধান্ত গাজা ও পশ্চিম তীর—উভয় জায়গাতেই নতুন উত্তেজনা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপীয় দেশগুলোর এই যৌথ অবস্থান ভবিষ্যতে কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে। যদিও অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ইসরাইল অনেক সময় আন্তর্জাতিক নিন্দা উপেক্ষা করেই বসতি নীতি চালিয়ে গেছে। তবুও একসঙ্গে এতগুলো প্রভাবশালী দেশের কণ্ঠে একই বার্তা শোনা গেলে তা কূটনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্ব পায়।
সব মিলিয়ে, পশ্চিম তীরে নতুন বসতি অনুমোদনের ঘটনাটি আবারও ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতের গভীর ও জটিল বাস্তবতাকে সামনে এনে দিয়েছে। শান্তি, নিরাপত্তা ও সহাবস্থানের যে আশা আন্তর্জাতিক মহল লালন করছে, এই সিদ্ধান্ত তা কতটা বাধাগ্রস্ত করবে—সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে বিশ্ব রাজনীতির আলোচনায়। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর কড়া বার্তা সত্ত্বেও ইসরাইল তার অবস্থানে অনড় থাকে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।