২০২৬ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বাড়াতে কিমের নির্দেশ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৮৭ বার
২০২৬ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বাড়াতে কিমের নির্দেশ

প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

উত্তর কোরিয়ার সামরিক নীতি ও অস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচিতে নতুন করে গতি আনার ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন। ২০২৬ সাল থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো, সেই সঙ্গে বিদ্যমান কারখানাগুলো আধুনিকায়ন এবং নতুন অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণের সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে এই তথ্য প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে দেশটির ভবিষ্যৎ সামরিক কৌশল।

রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি (কেসিএনএ) জানায়, শীর্ষ সামরিক ও শিল্প খাতের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে কিম জং উন সম্প্রতি একাধিক গোলাবারুদ ও অস্ত্র উৎপাদন কারখানা পরিদর্শন করেন। সফরের সময় তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেন, যেন কারখানাগুলো “রাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র ও আর্টিলারি বাহিনীর ভবিষ্যৎ পরিচালনাগত চাহিদা” পূরণে সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকে। কিমের বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে আসে যে, তিনি আগামী বছরগুলোতে সামরিক সক্ষমতা আরও বিস্তৃত ও প্রযুক্তিনির্ভর করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন।

কিম জং উন বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে সামগ্রিক উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। এজন্য বিদ্যমান উৎপাদন ব্যবস্থার আধুনিকায়নের পাশাপাশি নতুন গোলাবারুদ ও অস্ত্র কারখানা নির্মাণেরও নির্দেশ দেন তিনি। কেসিএনএর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কিম বিশেষভাবে জোর দেন উৎপাদনের গুণগত মান, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর।

উত্তর কোরিয়ার নেতা আরও বলেন, ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদ উৎপাদন খাত দেশের যুদ্ধ প্রতিরোধ ক্ষমতা জোরদারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব বহন করে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলাই শত্রু শক্তিকে নিরুৎসাহিত করার প্রধান উপায়। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে কিম কার্যত তার দীর্ঘদিনের অবস্থানই পুনর্ব্যক্ত করলেন, যেখানে সামরিক শক্তিকে তিনি জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার মূল ভিত্তি হিসেবে দেখেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র কার্যক্রম নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। স্বল্পপাল্লা থেকে শুরু করে আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পর্যন্ত নানা ধরনের অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে দেশটি। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব পরীক্ষার উদ্দেশ্য কেবল অস্ত্রের কার্যকারিতা যাচাই নয়; বরং নির্ভুল আঘাত হানার সক্ষমতা বৃদ্ধি, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে কৌশলগত ভারসাম্য তৈরি এবং সম্ভাব্যভাবে ভবিষ্যতে রাশিয়া বা অন্য মিত্রদেশে অস্ত্র রপ্তানির আগে প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি সম্পন্ন করা। যদিও পিয়ংইয়ং আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্র রপ্তানির বিষয়টি স্বীকার করে না, তবু বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে এ ধরনের সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে।

কিম জং উনের এই সফর ও নির্দেশনার খবর আসে এমন এক সময়ে, যখন উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম একদিন আগেই জানায় যে, তিনি একটি পারমাণবিক সাবমেরিন নির্মাণ কারখানা পরিদর্শন করেছেন। ওই সফরে কিম দক্ষিণ কোরিয়ার নিজস্ব পারমাণবিক সাবমেরিন তৈরির পরিকল্পনাকে “গুরুতর হুমকি” হিসেবে উল্লেখ করেন এবং এর মোকাবিলায় উত্তর কোরিয়ার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার করেন। সেখানে তাকে “নতুন ধরনের গোপন পানির নিচের অস্ত্র” নিয়ে চলমান গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পর্কেও অবহিত করা হয়।

এছাড়া কিম জং উন সম্প্রতি জাপান সাগরের ওপর দিয়ে নতুন ধরনের উচ্চ-উচ্চতায় দীর্ঘপাল্লার বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ সরাসরি তদারকি করেছেন বলেও কেসিএনএর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এই পরীক্ষাকে উত্তর কোরিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উন্নত যুদ্ধবিমান ও নজরদারি সক্ষমতার বিরুদ্ধে একটি কৌশলগত বার্তা।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে, উত্তর কোরিয়ার এই ধারাবাহিক সামরিক তৎপরতা পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান ইতোমধ্যে একাধিকবার উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার নিন্দা জানিয়েছে এবং এসব কার্যক্রমকে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। তবে পিয়ংইয়ং বরাবরের মতোই এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলছে, তাদের অস্ত্র কর্মসূচি সম্পূর্ণ আত্মরক্ষামূলক।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ২০২৬ সালের শুরুতে কোরিয়ান ওয়ার্কার্স পার্টির কংগ্রেসের প্রেক্ষাপটেই কিম জং উনের এই তৎপরতা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। উল্লেখ্য, দলটি পাঁচ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ওই কংগ্রেস আয়োজন করতে যাচ্ছে, যেখানে আগামী পাঁচ বছরের অর্থনৈতিক ও সামরিক উন্নয়ন পরিকল্পনা চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ওই কংগ্রেসে সামরিক শিল্পের সম্প্রসারণ, অস্ত্র উৎপাদন বৃদ্ধি এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার অর্থনৈতিক বাস্তবতাও এই ঘোষণার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, সীমিত বৈদেশিক বাণিজ্য এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপে দেশটির শিল্পখাত নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। তবুও সামরিক খাতে ব্যাপক বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত থেকে স্পষ্ট, কিম জং উন অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি সামরিক শক্তিকে সমান গুরুত্ব দিতে চাইছেন। তার সমর্থকেরা এটিকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য মনে করলেও সমালোচকেরা বলছেন, এতে সাধারণ জনগণের জীবনমান উন্নয়নের উদ্যোগ আরও পিছিয়ে পড়তে পারে।

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, উত্তর কোরিয়ার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে এই সামরিক সম্প্রসারণের সরাসরি সম্পর্ক খুব কমই প্রকাশ পায় রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে। খাদ্যসংকট, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনযাত্রার মান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ থাকলেও পিয়ংইয়ং এসব বিষয়ে খুব কম তথ্য প্রকাশ করে। ফলে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর ঘোষণার পাশাপাশি মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্নও নতুন করে সামনে এসেছে।

সব মিলিয়ে, ২০২৬ সাল থেকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সম্প্রসারণের নির্দেশ উত্তর কোরিয়ার সামরিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা নির্দেশ করছে। এটি একদিকে যেমন দেশটির আত্মরক্ষামূলক শক্তি বাড়ানোর বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে উত্তেজনার নতুন মাত্রা যোগ করছে। আগামী দিনে কোরিয়ান ওয়ার্কার্স পার্টির কংগ্রেস এবং এর মাধ্যমে ঘোষিত পরিকল্পনাগুলোই নির্ধারণ করবে, উত্তর কোরিয়া কোন পথে এগোতে যাচ্ছে—আর সেই পথের প্রভাব কতটা গভীরভাবে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রতিফলিত হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত