প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধকে প্রকাশ্য ‘জলদস্যুতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে রাশিয়া। ক্যারিবিয়ান সাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি ও ভেনেজুয়েলাকে ঘিরে অবরোধমূলক পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে বলে অভিযোগ করেছে মস্কো। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, এই পরিস্থিতি শুধু আঞ্চলিক উত্তেজনাই বাড়াচ্ছে না, বরং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও নৌ চলাচলের স্বাধীনতার জন্যও মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে।
বৃহস্পতিবার রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা এক নিয়মিত ব্রিফিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ক্যারিবিয়ান সাগরে বর্তমানে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা কার্যত অরাজকতার শামিল। তার ভাষায়, “আজ আমরা ক্যারিবিয়ান সাগরে এমন এক পরিস্থিতি দেখছি, যেখানে জলদস্যুতা ও ডাকাতি নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।” জাখারোভা দাবি করেন, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ আরোপ আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী এবং এটি ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায়ের স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে।
রাশিয়ার এই বক্তব্য এমন এক সময় এলো, যখন ভেনেজুয়েলাকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও মস্কোর মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই ভেনেজুয়েলার সরকার, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে আসছে। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, ভেনেজুয়েলায় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকার রক্ষার লক্ষ্যেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে রাশিয়া ও চীনসহ একাধিক দেশ এই অবস্থানকে ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে।
মারিয়া জাখারোভা তার বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি সরাসরি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, রাশিয়া ধারাবাহিকভাবে উত্তেজনা প্রশমনের পক্ষে কথা বলে আসছে এবং এই সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান চায়। তার মতে, আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকে পারস্পরিকভাবে গ্রহণযোগ্য সমাধান খোঁজা ছাড়া এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার অন্য কোনো পথ নেই। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিপর্যয় এড়াতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সঠিক ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নেবেন।
রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আরও বলেন, ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সরকারের যে প্রচেষ্টা, মস্কো তার প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখবে। তিনি জানান, ভেনেজুয়েলার স্থিতিশীল ও নিরাপদ উন্নয়ন নিশ্চিত করতে দেশটির সরকার যে পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে বৈধ। রাশিয়ার অবস্থান স্পষ্ট করে তিনি বলেন, কোনো দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার শুধুমাত্র সে দেশের জনগণেরই রয়েছে।
এই ইস্যু ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক পরিসরেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। জাখারোভা জানান, চলতি সপ্তাহে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক বৈঠকে ক্যারিবীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও নৌ অবরোধ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সেখানে অংশ নেওয়া বেশিরভাগ দেশ ওয়াশিংটনের পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে বলে তিনি দাবি করেন। অনেক দেশই আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, এই ধরনের সামরিক ও অবরোধমূলক কার্যক্রম গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যারিবিয়ান সাগর কেবল একটি আঞ্চলিক জলপথ নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সামুদ্রিক করিডর। এখানে অবাধ নৌ চলাচল ব্যাহত হলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। রাশিয়ার অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা পদক্ষেপ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে অস্থিরতা তৈরি করছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য উদ্বেগজনক।
রাশিয়া আরও দাবি করছে, এই ধরনের নৌ অবরোধ আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন, বিশেষ করে জাতিসংঘের সমুদ্র আইন সনদের মৌলিক নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। জাখারোভা বলেন, নৌ চলাচলের স্বাধীনতা আন্তর্জাতিক আইনের একটি মৌলিক নীতি। কোনো রাষ্ট্র যদি নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে অন্য দেশের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপ করে, তবে তা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর আঘাত হানে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নৌ অবরোধ’ শব্দটি ব্যবহার করতে অনিচ্ছুক। ওয়াশিংটনের বক্তব্য অনুযায়ী, তারা মূলত মাদক পাচার, অবৈধ অস্ত্র পরিবহন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে নৌবাহিনীর উপস্থিতি জোরদার করেছে। তবে সমালোচকদের মতে, বাস্তবে এই উপস্থিতি ভেনেজুয়েলার ওপর চাপ বাড়ানোর কৌশলের অংশ।
ভেনেজুয়েলার সরকারও রাশিয়ার বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছে। কারাকাস বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ দেশটির অর্থনীতি ও জনগণের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে। খাদ্য, ওষুধ ও জ্বালানি আমদানিতে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার সমর্থন ভেনেজুয়েলার জন্য কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি মূলত বড় শক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রতিফলন। লাতিন আমেরিকায় নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র যেমন তৎপর, তেমনি রাশিয়াও সেখানে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে চায়। ভেনেজুয়েলা এই শক্তি-রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে মার্কিন নৌ অবরোধ নিয়ে রাশিয়ার ‘জলদস্যুতা’ অভিযোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই বিতর্ক শুধু দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক আইন, সার্বভৌমত্ব এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলছে। কূটনৈতিক সমাধানের পথে না এগোলে এই উত্তেজনা আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।