মিয়ানমারে পাচারকালে ডিজেল-সিমেন্টসহ ১১ জন আটক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৯৭ বার
মিয়ানমারে পাচারকালে ডিজেল-সিমেন্টসহ ১১ জন আটক

প্রকাশ: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার এবং সমুদ্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নিয়মিত টহল কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বঙ্গোপসাগরে বড় ধরনের পাচারবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এই অভিযানে অবৈধভাবে মিয়ানমারে ডিজেল ও সিমেন্ট পাচারের সময় একটি ইঞ্জিনচালিত বোটসহ ১১ জন পাচারকারীকে আটক করেছে নৌবাহিনী। একই সঙ্গে জব্দ করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ও নির্মাণসামগ্রী, যা সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবৈধ বাণিজ্যের একটি সুসংগঠিত চক্রের অস্তিত্বের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

নৌবাহিনী সূত্র জানায়, শুক্রবার বঙ্গোপসাগরে নিয়মিত টহল চলাকালে কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া বহিঃনোঙর এলাকায় সন্দেহজনক একটি বোটের গতিবিধি নজরে আসে। প্রাথমিকভাবে সেটিকে মাছ ধরার বোট মনে হলেও এর চলাচল ও অবস্থান ঘিরে নৌবাহিনীর টহলদল সন্দেহ করে। এরই মধ্যে আগে থেকে পাওয়া গোপন তথ্যের সঙ্গে এই সন্দেহজনক গতিবিধির মিল পাওয়ায় নৌবাহিনী সতর্ক অবস্থান নেয় এবং ওই এলাকায় টহল জোরদার করে।

গোপন সূত্রে নৌবাহিনী জানতে পারে, একটি পাচারকারী চক্র সমুদ্রপথ ব্যবহার করে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে বাংলাদেশ থেকে সিমেন্ট ও ডিজেল মিয়ানমারে পাচার করছে। বিশেষ করে সেন্টমার্টিন দ্বীপ ও এর আশপাশের জলসীমাকে তারা নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে নৌবাহিনীর জাহাজগুলো সেন্টমার্টিন ও তৎসংলগ্ন এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধি করে এবং সম্ভাব্য সব রুটে কড়া টহল শুরু হয়।

টহলের একপর্যায়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজ ‘শহীদ মহিবুল্লাহ’ কুতুবদিয়া বাতিঘর থেকে প্রায় ৪২ নটিক্যাল মাইল দূরে একটি সন্দেহজনক মাছ ধরার বোট শনাক্ত করে। বোটটির গতিপথ, বোঝাইয়ের ধরন এবং আচরণ স্বাভাবিক মনে না হওয়ায় নৌবাহিনীর জাহাজ থেকে সেটিকে থামার সংকেত দেওয়া হয়। তবে সংকেত অমান্য করে বোটটি হঠাৎ দিক পরিবর্তন করে দ্রুতগতিতে পালানোর চেষ্টা চালায়। এতে নৌবাহিনীর সন্দেহ আরও দৃঢ় হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে ধাওয়া শুরু করা হয়।

নৌবাহিনীর জাহাজ ‘শহীদ মহিবুল্লাহ’ দ্রুত ও কৌশলী অভিযানের মাধ্যমে বোটটির পিছু নেয়। কিছু সময়ের মধ্যেই পালানোর সব চেষ্টা ব্যর্থ করে ‘এফবি অঙ্কিতা অন্বেষা’ নামের ইঞ্জিনচালিত বোটটিকে আটক করতে সক্ষম হয় নৌবাহিনী। বোটটি আটক করার পর তল্লাশি চালিয়ে ভেতরে লুকানো অবস্থায় ১০০০ লিটার ডিজেল এবং ৬৫০ বস্তা বাংলাদেশি ডায়মন্ড সিমেন্ট উদ্ধার করা হয়। এসব মালামাল কোনো বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই বহন করা হচ্ছিল, যা স্পষ্টভাবে পাচারের প্রমাণ বহন করে।

তল্লাশিকালে বোটে থাকা ১১ জন ব্যক্তিকেও আটক করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক ব্যক্তিরা স্বীকার করেন, অধিক মুনাফার আশায় তাঁরা এসব ডিজেল ও সিমেন্ট মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁরা জানান, বাংলাদেশে অপেক্ষাকৃত কম দামে এসব পণ্য সংগ্রহ করে সমুদ্রপথে মিয়ানমারে পাচার করা হলে সেখানে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি করা সম্ভব হয়। এই লোভেই তাঁরা ঝুঁকিপূর্ণ এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছেন।

নৌবাহিনী সূত্র আরও জানায়, উদ্ধারকৃত সিমেন্ট ও ডিজেল শুধু আর্থিক ক্ষতির বিষয় নয়, বরং এটি জাতীয় অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্যও হুমকিস্বরূপ। অবৈধভাবে জ্বালানি তেল পাচার হলে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি হয় এবং রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি অপরাধচক্র আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। একইভাবে সিমেন্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণসামগ্রী পাচার দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে পারে।

অভিযান শেষে জব্দকৃত মালামাল ও আটক ব্যক্তিদের পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চট্টগ্রামের পতেঙ্গা মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়। পুলিশ সূত্র জানায়, পাচারকারীদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আইনে মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং এই চক্রের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনে নৌবাহিনীর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও তদন্ত জোরদার করা হবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বঙ্গোপসাগর ও উপকূলীয় এলাকায় অবৈধ পাচার দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা। সীমান্তবর্তী সমুদ্রপথে নজরদারি দুর্বল হলে পাচারকারীরা সুযোগ নেয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নৌবাহিনীর টহল ও অভিযানের কারণে এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসছে। এই ধরনের অভিযান পাচারকারীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশ নৌবাহিনী জানিয়েছে, সমুদ্র ও উপকূলীয় অঞ্চলে সন্ত্রাস, মাদক পাচার, অস্ত্র চোরাচালান এবং অবৈধ বাণিজ্য দমনে তাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। দেশের সমুদ্রসীমা নিরাপদ রাখতে এবং সামুদ্রিক সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নৌবাহিনী সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে। নিয়মিত টহলের পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ভবিষ্যতেও আরও কঠোর অভিযান পরিচালনা করা হবে বলে নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যবর্তী সমুদ্রপথ দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন অবৈধ কার্যক্রমের জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেল, সিমেন্ট, চাল ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্য পাচারের ঘটনা মাঝেমধ্যেই ধরা পড়ে। এসব পাচার রোধে নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সাম্প্রতিক এই অভিযানের মাধ্যমে আবারও প্রমাণিত হলো, কার্যকর নজরদারি ও দ্রুত পদক্ষেপ নিলে সমুদ্রপথে অপরাধ দমন সম্ভব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত