প্রকাশ: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দিনাজপুরের খানসামা উপজেলায় বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে সৃষ্ট ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে একটি পোল্ট্রি খামার সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে খামারের প্রায় এক হাজার মুরগি পুড়ে মারা গেছে এবং খামারের অবকাঠামো ও সরঞ্জাম ধ্বংস হয়ে এক পরিবার কার্যত নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। শনিবার ভোরে সংঘটিত এই ঘটনায় স্থানীয়ভাবে ব্যাপক শোক ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে, পাশাপাশি গ্রামীণ পর্যায়ে ছোট উদ্যোক্তাদের নিরাপত্তা ও অগ্নি-সতর্কতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) ভোরবেলায় খানসামা উপজেলার ভাবকী ইউনিয়নের সাবেক গুলিয়াড়া গ্রামে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ক্ষতিগ্রস্ত খামারটি গ্রামের বাসিন্দা মনজুরুল ইসলামের মালিকানাধীন ‘মীম পোল্ট্রি খামার’। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভোরের নীরবতা ভেঙে হঠাৎ করেই খামারঘর থেকে আগুনের লেলিহান শিখা দেখা যায়। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো টিনশেড কাঠামোতে, যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগুনের সূত্রপাত হয় বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে। খামারের ভেতরে থাকা বৈদ্যুতিক সংযোগ ও তারের ত্রুটির কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। আগুন লাগার সময় খামারে দায়িত্বরত কর্মীরা চিৎকার শুরু করলে আশপাশের লোকজন দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। গ্রামের মানুষজন পানি, বালতি, মাটি ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করে আগুন নেভানোর প্রাণপণ চেষ্টা চালান। দীর্ঘ সময়ের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ততক্ষণে খামারের বড় একটি অংশ আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে খামারের ভেতরে থাকা মুরগিগুলো। খামার মালিক মনজুরুল ইসলাম জানান, আগুন লাগার পর মুরগিগুলো বের করে আনার কোনো সুযোগই পাওয়া যায়নি। অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো ঘর ধোঁয়া ও আগুনে ভরে যায়। তাঁর ভাষায়, “আগুনে খামারের ভেতরে থাকা প্রায় এক হাজার মুরগি পুড়ে মারা গেছে। শুধু মুরগিই নয়, খামারের টিনশেড ঘর, বৈদ্যুতিক সংযোগ, খাবারের মজুত, খাঁচা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামও সম্পূর্ণভাবে পুড়ে গেছে।”
মনজুরুল ইসলাম আরও বলেন, এই খামারই ছিল তাঁর পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও ধারদেনা করে তিনি খামারটি গড়ে তুলেছিলেন। এই দুর্ঘটনায় তাঁর আনুমানিক সাত থেকে আট লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। ক্ষতির অঙ্ক শুধু আর্থিক নয়, মানসিকভাবেও পরিবারটি ভেঙে পড়েছে। তিনি বলেন, “সবকিছু এক রাতেই শেষ হয়ে গেল। কীভাবে আবার শুরু করব, তা বুঝে উঠতে পারছি না।”
ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, পুড়ে যাওয়া টিনশেডের ভেতরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে পোড়া খাঁচা, গলিত প্লাস্টিক ও ছাই। বাতাসে এখনও পোড়া গন্ধ ভাসছে। প্রতিবেশীরা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে ছুটে আসেন। কেউ কেউ খাবার ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিয়ে সহায়তার আশ্বাস দেন। তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটির সামনে যে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা, তা স্পষ্ট।
ঘটনাটি নিশ্চিত করে ভাবকী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রবিউল আলম তুহিন বলেন, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে পোল্ট্রি খামারে অগ্নিকাণ্ডের বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি বলেন, “এ ধরনের দুর্ঘটনা শুধু একটি পরিবারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, পুরো এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও প্রভাব ফেলে। অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে আরও সজাগ ও সচেতন থাকতে হবে।” তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দেন এবং প্রশাসনের মাধ্যমে সম্ভাব্য সহায়তার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান।
স্থানীয়রা জানান, গ্রামীণ এলাকায় পোল্ট্রি খামারগুলোতে অনেক সময় অস্থায়ী বৈদ্যুতিক সংযোগ ব্যবহার করা হয়। নিয়মিত তদারকি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় এমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এই অগ্নিকাণ্ড সেই ঝুঁকিরই একটি করুণ উদাহরণ। তাঁদের মতে, খামার মালিকদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীতকালে বৈদ্যুতিক ব্যবহারের চাপ বাড়ে এবং পুরোনো বা নিম্নমানের তার ব্যবহারের কারণে শর্ট সার্কিটের ঘটনা বেশি ঘটে। পোল্ট্রি খামারের মতো জায়গায় যেখানে দাহ্য পদার্থ ও বিদ্যুৎ একসঙ্গে ব্যবহৃত হয়, সেখানে অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত বৈদ্যুতিক লাইন পরীক্ষা, মানসম্মত তার ব্যবহার এবং অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম রাখলে এমন দুর্ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
এদিকে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটির জন্য সরকারি বা বেসরকারি সহায়তার দাবি উঠেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সমাজকর্মীরা বলছেন, ছোট উদ্যোক্তারা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁদের এমন বিপর্যয়ে দ্রুত সহায়তা না পেলে আবার ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাই প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রণোদনা বা পুনর্বাসন সহায়তা দেওয়া হলে পরিবারটি নতুন করে শুরু করার সাহস পাবে।
দিনাজপুর জেলার গ্রামীণ অর্থনীতিতে পোল্ট্রি খামার একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। বহু পরিবার এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু অগ্নিকাণ্ড, রোগবালাই ও বাজারমূল্যের ওঠানামার কারণে এই খাতে ঝুঁকি সবসময়ই থাকে। শনিবারের এই অগ্নিকাণ্ড সেই ঝুঁকিকে আরও একবার সামনে এনে দিয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, শুধু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার নয়, আশপাশের খামার মালিকদের মাঝেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষয়ক্ষতির তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রাথমিকভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আগুনের কারণ ও ক্ষতির পরিমাণ যাচাই করা হবে। পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।