ট্রাম্প প্রশাসনের বড়দিনের হামলা: নাইজেরিয়ায় বিমানে আঘাত ও তীব্র প্রতিক্রিয়া

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৭৮ বার
ট্রাম্প প্রশাসনের বড়দিনের হামলা: নাইজেরিয়ায় বিমানে আঘাত ও তীব্র প্রতিক্রিয়া

প্রকাশ: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পশ্চিম আফ্রিকার শক্তিশালী ও ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নাইজেরিয়ায় ২০২৫ সালের বড়দিনের দিনে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে উত্তেজনা ছড়িয়ে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ। ২৫ ডিসেম্বর বুধবার রাতে মার্কিন প্রশাসন ইসলামিক স্টেট (আইএস)–এর সঙ্গে যুক্ত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালায় উত্তর-পশ্চিম নাইজেরিয়ার সোকোটো রাজ্যের কিছু এলাকায়, যেখানে জঙ্গি কার্যক্রমের সন্দেহপূর্ণ অবস্থান লক্ষ্য করা হয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজ স্বত্ত্বায় এই অভিযান পরিচালিত হয়েছে বলে ঘোষণা করেছেন এবং তিনি এটিকে ইসলামী চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে একটি “শক্তিশালী ও প্রাণঘাতী” পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক হস্তক্ষেপকে বিশ্লেষকরা রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত দুই দিক দিয়ে দেখছেন। ট্রাম্প প্রশাসন হামলাটি নিশানা বানিয়েছে আইএস-সহ তার স্থানীয় শাখা বিস্তৃত সন্ত্রাসী জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর উপর, যারা দীর্ঘদিন ধরেই নাইজেরিয়ার উত্তরাঞ্চলে সহিংসতা চালিয়ে আসছে। নাইজেরিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি বহু বছরে জটিলভাবে বদলেছে, যেখানে বোকো হারাম এবং ইসলামিক স্টেট ওয়েস্ট আফ্রিকা প্রভিন্স (আইএসডব্লিউএপি)–এর মতো সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো নানামুখী আক্রমণে যুক্ত হয়েছে এবং প্রায়শই খ্রিস্টান ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই তাদের সহিংসতার শিকার হচ্ছে।

ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই বিমান হামলাকে ‘বড়দিনের উপহার’ হিসেবে ব্যাখ্যা করে মন্তব্য করেছেন যে, “আইএসকে বড়দিনে আঘাত করা হবে” এবং এটি একটি শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া হিসেবে সমাজের সামনে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর ভাষায়, এই ধরনের অভিযানের মাধ্যমে তিনি “উগ্র ইসলামপন্থী সন্ত্রাসবাদকে মাথা ঠেকাতে” চান।

তবে এই মন্তব্যটি আন্তর্জাতিক পরিসরে এবং বিশেষ করে নাইজেরিয়ার ভেতরে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এমন মন্তব্য আন্তর্জাতিক নীতির দিক থেকে বিতর্কিত; কেননা একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের মাটিতে বিদেশি শক্তি দ্বারা হামলা চালানোর কথা যদি ‘উপহার’ বলে উদযাপন করা হয়, তাহলে সেটি নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও ধর্মীয় সংবেদনশীলতা—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। নাইজেরিয়ার মত একটি বড় ও বহু ধর্মীয় জনগণের দেশ যে নিজেদের সীমানা ও আইনগত কাঠামো রক্ষা করতে ব্যস্ত থাকে, সেখানে বাইরের কোনো শক্তির সামরিক হস্তক্ষেপকে ইতিবাচক রূপে দেখাতে খাটো আন্তর্জাতিক পরামর্শদাতাদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।

নাইজেরিয়ার সরকারি পক্ষ ক্ষুদ্র দেশের সঙ্গে এই ধরনের অভিযানের ব্যাপারে সতর্ক ভূমিকা নিয়েছে। নাইজেরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রী ও সরকারের অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন যে, দেশটি সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতায় আন্তঃরাষ্ট্রীয় সমর্থন স্বাগত জানাবে তবে তা অবশ্যই দেশটির সার্বভৌমত্ব ও আইনগত কাঠামোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। তারা বারবার জোর দিয়ে বলেছেন, বিদেশি সামরিক পদক্ষেপ হলে তা দেশিক জনগণের আস্থা ও জাতীয় গৌরবকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

অন্যদিকে সাধারণ নাগরিকরা এ ঘটনায় বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। নাইজেরিয়ার লাগোসসহ অন্যান্য শহরের বাসিন্দারা বলেন, যদি বিদেশি শক্তি শান্তি ও নিরাপত্তা আনতে সহযোগিতা করে, তাহলে তা সমর্থনের যোগ্য। কেউ কেউ মনে করছেন, নিরাপত্তা বাহিনীর অভাব ও সীমাবদ্ধতার কারণে এই ধরনের উপদানের প্রয়োজন হতে পারে। আবার অনেকে মনে করেন, স্বনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন এবং দেশটির স্বাধীন ফৌজ ও গোয়েন্দা সংস্থাকে সমর্থন করা উচিত, যাতে নিজেরাই সন্ত্রাস নির্মূলের সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বিরুদ্ধে সমালোচনার একটি বড় অংশ এসেছে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকেও। তারা বলছেন, একটি দেশের ভূখণ্ডে হামলা চালানোর আগে আন্তর্জাতিক আইনের দিক থেকে সুস্পষ্ট অনুমোদন ও যৌথ উদ্যোগ থাকা উচিত। সার্বভৌম রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনীর সহযোগিতা ছাড়া অভিযান হলে তা আন্তর্জাতিক নীতির ব্যত্যয় হিসেবে ধরা যেতে পারে। তাঁরা মনে করেন, নিরাপত্তা সহযোগিতা ও তথ্যভিত্তিক অভিযানেই এমন ধরনের সন্ত্রাসবিরোধী লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা উচিত, যেন মানুষ ও তাদের অধিকারকে সর্বোচ্চভাবে রক্ষা করা যায়।

এসব বিবৃতির মধ্যেও জানা গেছে, নাইজেরিয়ার সরকার ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আগে থেকেই নির্দিষ্ট সহযোগিতা ও গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ছিল, এবং হামলা কার্যক্রমটি স্থানীয় সরকারের অনুরোধে ও যৌথভাবে পরিচালিত হয়েছে। তবে এর পরিপ্রেক্ষিত ও ব্যাখ্যায় ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে। নাইজেরিয়ার একাংশ বিশ্লেষক মনে করছেন, এই ধরনের অভিযানে মিলিত প্রচেষ্টা জরুরি হলেও, তা দেশটির নিজের পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে হওয়া উচিত ছিল।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও এই হামলার ব্যাপারে মতভেদ লক্ষ্য করা গেছে। ট্রাম্পের সমর্থক ডানপন্থী রাজনৈতিক কর্মীরা হামলাকে ধর্মীয় সহিংসতার জবাব হিসেবেই উদযাপন করছেন এবং এটি বড়দিনে করা একটি ‘উপহার’ বলে ব্যাখ্যা করছেন। তাদের মতে, ইসলামিক সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়ার মধ্যেই খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা রক্ষার ইঙ্গিত রয়েছে।

তবে অনেক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও মানবাধিকার সংগঠন এসব মন্তব্যকে উদ্বেগজনক বলে দেখছেন, কারণ এসবের ফলে ধর্মীয় অনুভূতিকে রাজনৈতিক সমর্থনের একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে এবং এমন ব্যবহারের ফলে মুনাফা বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এক সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বৈপরীত্য সৃষ্টি হতে পারে। তারা মনে করেন, নিরাপত্তা নীতি ও সামরিক পদক্ষেপ ধর্মীয় সংবেদনশীলতা থেকে আলাদা রেখে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও আইনের সাথে সঙ্গতি রেখে বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে একটি সুষ্ঠু ও সামগ্রিক শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি নিশ্চিত করা যায়।

নাইজেরিয়ার এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট যে, আন্তর্জাতিক সামরিক পদক্ষেপে যেমন সহযোগিতা ও ভয়াবহ সন্ত্রাসবাদ দাবির মোকাবিলা জরুরি, তেমনি সার্বভৌমত্ব, আন্তর্জাতিক আইনী কাঠামো, ধর্মীয় সহনশীলতা ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা—এসব বিষয়গুলোও সমানভাবে গুরুত্ব পেতে চাই। নাইজেরিয়ায়য়ের হামলা ও তার পরবর্তী প্রতিক্রিয়া একটি জটিল আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও নিরাপত্তা দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করছে, যেখানে প্রতিটি পক্ষের যুক্তি, উদ্বেগ ও আশা মিলেই একটি বৃহত্তর বিশ্বব্যাপী আলোচনার দরজা খুলে যাচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত