তাইওয়ানের চারপাশে সামরিক মহড়ার ঘোষণা চীনের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৭৯ বার
তাইওয়ানের চারপাশে সামরিক মহড়ার ঘোষণা চীনের

প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে পূর্ব এশিয়ায় নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। দ্বীপটির চারপাশে বড় ধরনের সামরিক মহড়া পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছে চীন। চীনা সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মঙ্গলবার তাইওয়ানের নিকটবর্তী জলসীমা ও আকাশসীমার পাঁচটি অঞ্চলে সরাসরি গুলি চালানোর মহড়া অনুষ্ঠিত হবে। এই ঘোষণার পরপরই তাইওয়ান প্রতিক্রিয়াস্বরূপ নিজেদের ‘উপযুক্ত বাহিনী’ মোতায়েনের কথা জানিয়েছে। ফলে তাইওয়ান প্রণালী ঘিরে সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।

চীনের সামরিক মুখপাত্র সিনিয়র কর্নেল শি ইয়ের দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, ২৯ ডিসেম্বর থেকে পিপলস লিবারেশন আর্মি বা পিএলএর ইস্টার্ন থিয়েটার কমান্ড ‘জাস্টিস মিশন ২০২৫’ কোড-নামে একটি যৌথ সামরিক মহড়া শুরু করছে। এই মহড়ায় চীনের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও রকেট ফোর্স একসঙ্গে অংশ নেবে। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, তাইওয়ান ঘিরে আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় রেখেই এ মহড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, এই মহড়ার অংশ হিসেবে মঙ্গলবার তাইওয়ানের চারপাশে সরাসরি গুলি চালানোর অনুশীলন করা হবে, যা সাম্প্রতিক সময়ে বিরল এবং অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

চীনের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, এই সামরিক তৎপরতা কোনো নির্দিষ্ট পক্ষকে লক্ষ্য করে নয়; বরং জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার প্রস্তুতির অংশ। তবে বাস্তবতা হলো, তাইওয়ান ইস্যুতে বেইজিং দীর্ঘদিন ধরেই কঠোর অবস্থান নিয়ে আসছে। চীন তাইওয়ানকে তার একটি বিচ্ছিন্ন প্রদেশ হিসেবে দাবি করে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দ্বীপটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কথা কখনোই অস্বীকার করেনি। সাম্প্রতিক এই মহড়ার ঘোষণা সেই নীতিরই একটি স্পষ্ট প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

চীনের ঘোষণার পর দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তাইওয়ান। দেশটির প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের মুখপাত্র কারেন কুও এক বিবৃতিতে চীনের এই পদক্ষেপকে ‘সামরিক ভীতি প্রদর্শন’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, তাইওয়ান সরকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, দ্বীপের চারপাশে চীনের সামরিক মহড়ার জবাবে তাইওয়ান ‘উপযুক্ত বাহিনী’ মোতায়েন করেছে, যাতে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যায়। একই সঙ্গে তিনি আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রেও জানা গেছে, চীনের বিমান ও নৌযানের গতিবিধি নজরদারিতে রাখা হয়েছে এবং জরুরি প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সামরিক ইউনিটগুলোকে সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। যদিও তাইওয়ান সরকার উত্তেজনা বাড়ানোর পথে হাঁটতে চায় না, তবু জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে তারা কোনো ধরনের আপস করবে না—এমন বার্তাই স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

এই সামরিক মহড়ার পেছনে সাম্প্রতিক আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহের প্রভাব রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত মাসে জাপান তাইওয়ানের কাছাকাছি এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করে। এই ঘোষণার পরপরই চীন তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সতর্ক করে দেয়, তাইওয়ান ইস্যুতে যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপ কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে। বেইজিং স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, তাদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার ক্ষেত্রে তারা আপসহীন এবং প্রয়োজনে শক্ত অবস্থান নিতে প্রস্তুত।

চীনা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘আমাদের দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি ও দৃঢ় সংকল্প রয়েছে। জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষা করার মতো পর্যাপ্ত সামরিক সক্ষমতাও আমাদের আছে।’ এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে চীন মূলত যুক্তরাষ্ট্র, জাপানসহ তাইওয়ানের মিত্র দেশগুলোর প্রতি একটি শক্ত বার্তা দিতে চেয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।

বিশ্লেষকদের মতে, তাইওয়ান প্রণালী বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম স্পর্শকাতর ভূরাজনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। এখানে সামান্য উত্তেজনাও বৃহত্তর আঞ্চলিক কিংবা বৈশ্বিক সংঘাতের রূপ নিতে পারে। কারণ, তাইওয়ান শুধু চীন ও তাইওয়ানের মধ্যকার দ্বন্দ্বের বিষয় নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং অন্যান্য পশ্চিমা শক্তির কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারে সহায়তা করে আসছে, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে তারা ‘এক চীন নীতি’ মেনে চলে। এই দ্বৈত নীতিই বেইজিংয়ের চোখে সন্দেহ ও অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এই সামরিক উত্তেজনার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। তাইওয়ানের বাসিন্দাদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, একই সঙ্গে চীনের উপকূলবর্তী অঞ্চলেও সতর্কতা জারি রয়েছে। জেলে, ব্যবসায়ী ও নৌযান চলাচলের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের জন্য এই ধরনের সামরিক মহড়া অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি তৈরি করে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথে সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কূটনৈতিক অঙ্গনে এখন নজর রয়েছে, এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিগুলো কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায়। অতীতে দেখা গেছে, চীনের সামরিক মহড়ার পর যুক্তরাষ্ট্র প্রায়ই তাইওয়ান প্রণালীতে নৌযান পাঠিয়ে ‘নৌ চলাচলের স্বাধীনতা’ নিশ্চিত করার বার্তা দেয়। ফলে বর্তমান পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সব মিলিয়ে, তাইওয়ানের চারপাশে চীনের ঘোষিত সামরিক মহড়া শুধু একটি সামরিক অনুশীলন নয়; এটি আঞ্চলিক রাজনীতি, আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও শক্তির ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে। শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খোলা থাকলেও শক্তি প্রদর্শনের এই রাজনীতি পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো সংযম দেখিয়ে কূটনৈতিক সমাধানের পথে এগোয়, নাকি সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়তে থাকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত