প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় শীতের প্রকোপ আপাতত একই মাত্রায় থাকতে পারে—এমন বার্তাই দিয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। সোমবার সকাল ৭টা থেকে পরবর্তী ছয় ঘণ্টার জন্য দেওয়া পূর্বাভাসে সংস্থাটি জানিয়েছে, তাপমাত্রায় বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। আকাশ আংশিক মেঘলা থাকতে পারে, আবহাওয়া থাকবে শুষ্ক এবং ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া উত্তর-উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ৮ থেকে ১২ কিলোমিটার বেগে বাতাস প্রবাহিত হতে পারে, যা শীতের অনুভূতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকাল ৬টায় ঢাকায় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দিনের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে এসেছে ১৩ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। শীত মৌসুমের এই সময়ে রাজধানীতে এমন তাপমাত্রা খুব অস্বাভাবিক নয়, তবে বাতাস ও কুয়াশার কারণে অনুভূত শীত অনেকের কাছেই বেশি ঠান্ডা বলে মনে হচ্ছে। বিশেষ করে ভোরবেলা ও সকালে কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী এবং খেটে খাওয়া মানুষদের জন্য এই ঠান্ডা বাড়তি ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, শীতের এই ধারা মূলত উত্তর দিক থেকে আসা শীতল ও শুষ্ক বায়ুর প্রভাবে সৃষ্টি হয়েছে। হিমালয় ও উত্তর ভারতের অঞ্চল থেকে আসা এই বায়ুপ্রবাহ উত্তরবঙ্গ হয়ে ধীরে ধীরে দেশের মধ্যাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় রাতের তাপমাত্রা কম থাকছে এবং ভোরে কুয়াশা জমছে। দিনের বেলায় সূর্যের আলো কিছুটা মিললেও বাতাসের কারণে শীতের অনুভূতি কাটছে না।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সকালবেলা কুয়াশার চিত্র চোখে পড়ছে। সড়কে চলাচলকারী যানবাহনগুলোকে হেডলাইট জ্বালিয়ে চলতে দেখা যাচ্ছে, কোথাও কোথাও দৃশ্যমানতা কমে আসায় যান চলাচলও ধীর হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে নদীঘেঁষা এলাকা ও খোলা স্থানে কুয়াশার ঘনত্ব তুলনামূলক বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এতে সকালবেলার অফিসগামী মানুষ ও শিক্ষার্থীদের চলাচলে কিছুটা অসুবিধা হচ্ছে।
শীতের এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনেও। ভোরে কাজে বের হওয়া রিকশাচালক, দিনমজুর ও হকারদের অনেকেই ঠান্ডা থেকে বাঁচতে অতিরিক্ত কাপড় পরছেন, কেউ কেউ আগুন জ্বালিয়ে শরীর গরম করার চেষ্টা করছেন। রাজধানীর ফুটপাত ও বস্তি এলাকায় বসবাসকারী নিম্নআয়ের মানুষের জন্য এই শীত বিশেষভাবে কষ্টকর হয়ে উঠেছে। পর্যাপ্ত গরম কাপড়ের অভাবে শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে মনে করছেন সমাজকর্মীরা।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের শীত ও শুষ্ক আবহাওয়ায় সর্দি-কাশি, জ্বর, শ্বাসকষ্টসহ নানা মৌসুমি রোগের প্রকোপ বাড়তে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও শ্বাসতন্ত্রের রোগে ভোগা মানুষদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ঠান্ডা এড়াতে গরম কাপড় পরা, কুয়াশাচ্ছন্ন সময়ে বাইরে বের হলে মুখ ঢেকে রাখা এবং পর্যাপ্ত উষ্ণ খাবার গ্রহণের ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আপাতত রাজধানী ঢাকায় দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। অর্থাৎ আগামী কয়েক ঘণ্টা বা দিনের মধ্যে তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার সম্ভাবনা কম। তবে আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, জানুয়ারি মাসের শুরুতে নতুন করে শৈত্যপ্রবাহের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। উত্তরাঞ্চলে শৈত্যপ্রবাহ শুরু হলে তার প্রভাব ধীরে ধীরে মধ্যাঞ্চলেও পড়তে পারে।
শীতের এই পরিস্থিতি নগর জীবনের পাশাপাশি কৃষি ও অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও ঢাকা শহরে কৃষিকাজ সীমিত, তবে আশপাশের এলাকায় শীতকালীন সবজি চাষের জন্য এই আবহাওয়া একদিকে যেমন সহায়ক, অন্যদিকে অতিরিক্ত কুয়াশা ফসলের জন্য ক্ষতিকরও হতে পারে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কুয়াশা বেশি হলে রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বাড়ে, তাই কৃষকদের সতর্ক থাকতে হবে।
নগর কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ইতোমধ্যে শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গরম কাপড় বিতরণ, শীতবস্ত্র সংগ্রহ কর্মসূচি এবং আশ্রয়কেন্দ্র চালুর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শীত মৌসুম দীর্ঘ হলে এই উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন হবে।
সামগ্রিকভাবে, আবহাওয়া অফিসের বার্তা অনুযায়ী ঢাকায় শীতের প্রকোপ আপাতত একই রকম থাকবে। তাপমাত্রা খুব বেশি কমার পূর্বাভাস না থাকলেও কুয়াশা ও বাতাসের কারণে শীতের অনুভূতি অব্যাহত থাকবে। নগরবাসীর জন্য এটি যেমন শীতকালীন স্বস্তি বয়ে আনে, তেমনি প্রান্তিক ও অসহায় মানুষের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। তাই এই সময়টাতে ব্যক্তিগত সতর্কতার পাশাপাশি সামাজিক সহানুভূতি ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়াই হতে পারে শীত মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।