ইন্দোনেশিয়ায় বৃদ্ধাশ্রমে ভয়াবহ আগুনে নিহত ১৬

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৭৬ বার
ইন্দোনেশিয়ায় বৃদ্ধাশ্রমে ভয়াবহ আগুনে নিহত ১৬

প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইন্দোনেশিয়ায় আবারও এক হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন বহু নিরীহ মানুষ। দেশটির উত্তর সুলাওয়েসি প্রদেশের রাজধানী মানাডোতে একটি বৃদ্ধাশ্রমে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কমপক্ষে ১৬ জন নিহত হয়েছেন। রোববার স্থানীয় সময় রাত আনুমানিক ৮টা ৩৬ মিনিটে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। আগুন লাগার খবর মুহূর্তের মধ্যেই এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং বৃদ্ধাশ্রমে অবস্থানরত অসহায় ও শারীরিকভাবে দুর্বল বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে যায়। বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, আগুন লাগার সময় ভবনটিতে থাকা অধিকাংশ মানুষ বয়সজনিত কারণে চলাফেরায় অক্ষম ছিলেন, ফলে দ্রুত বের হয়ে আসা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।

স্থানীয় পুলিশ ও দমকল বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, আগুন লাগার পরপরই তিনটি ফায়ার সার্ভিস ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার ও নিয়ন্ত্রণ কাজ শুরু করে। প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টার পর রাত সাড়ে ৯টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। তবে ততক্ষণে আগুন ভবনের একটি বড় অংশ গ্রাস করে ফেলেছিল। ধোঁয়া ও আগুনে আটকে পড়া অনেক বৃদ্ধ আর বের হতে পারেননি। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া কয়েকজনকে গুরুতর অবস্থায় স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

উত্তর সুলাওয়েসি আঞ্চলিক পুলিশের জনসংযোগ কর্মকর্তা আলমসিয়াহ পি. হাসিবুয়ান জানান, নিহতদের মরদেহ উত্তর সুলাওয়েসি আঞ্চলিক পুলিশের হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে এবং সেখানে পরিচয় শনাক্তের কাজ চলছে। তিনি বলেন, “এটি অত্যন্ত দুঃখজনক একটি ঘটনা। নিহতদের বেশিরভাগই বৃদ্ধ ও অসুস্থ ছিলেন। পরিবারগুলোকে খবর দেওয়া হচ্ছে এবং মরদেহ শনাক্তের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।”

মানাডো ফায়ার সার্ভিস বিভাগের প্রধান জিমি রতিনসুলু বলেন, অগ্নিকাণ্ডের সময় ভবনটিতে থাকা বাসিন্দাদের বড় একটি অংশ বয়সজনিত শারীরিক দুর্বলতায় ভুগছিলেন। অনেকেই বিছানা থেকে ওঠার মতো অবস্থায় ছিলেন না। ফলে আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর তারা কার্যত ভবনের ভেতরেই আটকে পড়েন। তিনি আরও জানান, আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় উদ্ধারকাজে দমকল কর্মীদেরও বড় ধরনের ঝুঁকি নিতে হয়েছে।

প্রাথমিকভাবে আগুন লাগার সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি। তবে পুলিশ জানিয়েছে, বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করা হয়েছে। বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট, রান্নাঘরের গ্যাস লাইন বা অন্য কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে—সব দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আগুনের কারণ সম্পর্কে কোনো চূড়ান্ত মন্তব্য করতে রাজি হয়নি পুলিশ।

এই দুর্ঘটনা ইন্দোনেশিয়ার সমাজে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই নিহতদের প্রতি শোক ও সমবেদনা জানাচ্ছেন। একই সঙ্গে বৃদ্ধাশ্রম ও অনুরূপ আবাসিক প্রতিষ্ঠানে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যেসব স্থানে শিশু, বৃদ্ধ বা শারীরিকভাবে অক্ষম মানুষ বসবাস করেন, সেখানে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর হওয়া জরুরি। কারণ, জরুরি মুহূর্তে নিজেরা বেরিয়ে আসার সক্ষমতা না থাকায় এই মানুষগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, আগুন লাগার সময় আশপাশের মানুষ ছুটে এসে সাহায্যের চেষ্টা করলেও ধোঁয়া ও তীব্র তাপের কারণে ভবনের ভেতরে প্রবেশ করা সম্ভব হয়নি। অনেকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, ভবনের ভেতর থেকে সাহায্যের আর্তনাদ শোনা যাচ্ছিল, কিন্তু কিছু করার ছিল না। এই মানবিক বেদনাই দুর্ঘটনাটিকে আরও হৃদয়বিদারক করে তুলেছে।

ইন্দোনেশিয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে আবাসিক ভবন, হাসপাতাল ও সামাজিক সেবাকেন্দ্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে পুরোনো ভবনগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাব ও নিয়মিত পরিদর্শনের ঘাটতির কারণে প্রাণহানির ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন। এই দুর্ঘটনার পর আবারও সেই পুরোনো প্রশ্ন সামনে এসেছে—দেশটির সামাজিক সেবাকেন্দ্রগুলো কতটা নিরাপদ?

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, উত্তর সুলাওয়েসি প্রাদেশিক প্রশাসন ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে বৃদ্ধাশ্রম ও অনুরূপ প্রতিষ্ঠানের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনরায় পর্যালোচনা করার কথাও ভাবা হচ্ছে।

মানবাধিকার ও সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো বলছে, এই দুর্ঘটনা শুধু একটি অগ্নিকাণ্ড নয়; এটি সমাজে প্রবীণদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নকেও সামনে নিয়ে এসেছে। তারা দাবি করছে, বৃদ্ধাশ্রমে বসবাসকারী মানুষদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। নিয়মিত নিরাপত্তা মহড়া, আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত জনবল না থাকলে এমন দুর্ঘটনা বারবার ঘটতে পারে।

এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ইন্দোনেশিয়ার সাধারণ মানুষের মনে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যাদের স্বজনেরা বিভিন্ন বৃদ্ধাশ্রমে বসবাস করছেন, তারা নতুন করে নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের কাছে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

সব মিলিয়ে, উত্তর সুলাওয়েসির মানাডোর এই অগ্নিকাণ্ড একটি মর্মান্তিক মানবিক বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ১৬ জন বৃদ্ধ মানুষের প্রাণহানি শুধু একটি সংখ্যা নয়; এটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তদন্তের ফলাফল কী আসে এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা রোধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়—সেদিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া তথা আন্তর্জাতিক মহল। এই ঘটনায় নিহতদের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়ে বিশ্ববাসী প্রত্যাশা করছে, এমন মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন আর না ঘটে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত