প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও চতুর্থ গণভোটকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আজ এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন আজ সোমবার। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। সেই লক্ষ্যেই গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সারাদেশে রাজনৈতিক দল, স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং বিভিন্ন জোটের মধ্যে নির্বাচনী প্রস্তুতি, হিসাব-নিকাশ ও কৌশল নির্ধারণে ব্যস্ত সময় পার হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল রোববার পর্যন্ত সারাদেশে মোট দুই হাজার ৭৮০টি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে জমা পড়েছে তুলনামূলকভাবে কম, প্রায় অর্ধশত মনোনয়নপত্র। ইসির কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটি রোববার বিকাল ৪টা পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করে জানায়, সাধারণত মনোনয়নপত্র জমার শেষ দিনেই সবচেয়ে বেশি প্রার্থী তাদের কাগজপত্র দাখিল করেন। সেই ধারাবাহিকতায় আজ শেষ দিনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইসি সূত্র জানায়, প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দেওয়ার সময় নির্ধারিত ছিল। প্রার্থীদের মধ্যে অনেকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করছেন রাজনৈতিক সমঝোতা, জোটগত সিদ্ধান্ত কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী পরিস্থিতি বিবেচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে। বিশেষ করে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীরা শেষ দিনে দলীয় সমর্থকদের নিয়ে সীমিত উপস্থিতির মধ্যেই মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন।
ইসির প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, অঞ্চলভিত্তিক মনোনয়নপত্র উত্তোলনের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা অঞ্চল। এখান থেকে মোট ৫০১টি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। এরপর কুমিল্লা অঞ্চল থেকে ৪০৫টি, ময়মনসিংহ থেকে ৩৩৯টি, খুলনা থেকে ৩০২টি, রংপুর থেকে ২৮৩টি, রাজশাহী থেকে ২৬৯টি, চট্টগ্রাম থেকে ২৪০টি, বরিশাল থেকে ১৬১টি, ফরিদপুর থেকে ১৪৫টি এবং সিলেট অঞ্চল থেকে ১২৭টি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়। এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল এলাকাগুলোতে নির্বাচন ঘিরে আগ্রহ তুলনামূলকভাবে বেশি।
তবে মনোনয়নপত্র জমার ক্ষেত্রে চিত্র কিছুটা ভিন্ন। সবচেয়ে বেশি আটটি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে ফরিদপুর অঞ্চলে। ময়মনসিংহ ও বরিশাল অঞ্চলে সাতটি করে, রংপুরে তিনটি, ঢাকা ও চট্টগ্রামে দুটি করে এবং খুলনা ও সিলেট অঞ্চলে একটি করে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। রাজশাহী ও কুমিল্লা অঞ্চলে গতকাল পর্যন্ত কোনো মনোনয়নপত্র জমা পড়েনি। ইসি কর্মকর্তারা মনে করছেন, এসব অঞ্চলেও শেষ দিনে হঠাৎ করেই জমার সংখ্যা বাড়বে।
ঢাকা বিভাগে নির্বাচনে অংশ নিতে ইচ্ছুক প্রার্থীদের মধ্যে গতকাল দুপুর থেকেই রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে যেসব প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা-১০ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শেখ রবিউল আলম রবি, ঢাকা-৬ আসনের ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন, ঢাকা-১৪ আসনের সানজিদা ইসলাম তুলি, ঢাকা-১৬ আসনের আমিনুল ইসলাম, ঢাকা-১৭ আসনের জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী ডা. এসএম খালেদুজ্জামান, কমিউনিস্ট পার্টি মনোনীত ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী ত্রিদিপ কুমার সাহা এবং ঢাকা-১৭ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মেজর ব্যারিস্টার সারওয়ার। ইসি জানায়, এ পর্যন্ত ঢাকায় স্বতন্ত্র ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মোট ৩২৯ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন এবং জমা দিয়েছেন ১১ জন।
নির্বাচন কমিশন মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর আচরণবিধি আরোপ করেছে। প্রার্থী বা তার প্রস্তাবক ও সমর্থকসহ পাঁচজনের বেশি একসঙ্গে উপস্থিত থাকতে পারবেন না। কোনো ধরনের মিছিল, শোডাউন বা জনসমাগম করলে তা আচরণবিধি লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে। ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে মনোনয়নপত্র জমা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে।
মনোনয়নপত্র জমা শেষে নির্বাচন প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপগুলোও নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী এগোবে। ইসির তথ্য অনুযায়ী, ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হবে। রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করা যাবে ৫ থেকে ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত। আপিল নিষ্পত্তি হবে ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারির মধ্যে। এরপর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ২০ জানুয়ারি এবং ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে। সবশেষে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
এর আগে গত ১১ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে ভাষণের মাধ্যমে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন। সেই ভাষণে তিনি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দেন এবং সকল রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের আচরণবিধি মেনে নির্বাচনে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।
এদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বড় দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ। ইসির তথ্যমতে, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ কয়েকজন সম্ভাব্য প্রার্থী ইতোমধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। এতে করে নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সব মিলিয়ে মনোনয়নপত্র জমার শেষ দিনে আজ সারাদেশের নির্বাচন অফিসগুলোতে ব্যস্ততা চরমে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। কোন দল বা প্রার্থী শেষ পর্যন্ত কতগুলো আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামছে, তার একটি স্পষ্ট চিত্র আজকের দিন শেষে পরিষ্কার হবে। সেই সঙ্গে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী লড়াই আজ থেকেই নতুন মাত্রা পেতে যাচ্ছে।