ইসরাইলের বিরুদ্ধে ঐক্যের ডাক, আত্মসমর্পণ নয়: হিজবুল্লাহ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৭০ বার
ইসরাইলের বিরুদ্ধে ঐক্যের ডাক, আত্মসমর্পণ নয়: হিজবুল্লাহ

প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইসরাইলের বিরুদ্ধে কোনো অবস্থাতেই আত্মসমর্পণ করা হবে না—এই দৃঢ় বার্তা দিয়ে লেবাননের জনগণ ও রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রতি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন হিজবুল্লাহর মহাসচিব শেখ নাইম কাসেম। রোববার আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ইসরাইলের আকাশ, স্থল ও নৌ আগ্রাসন অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে দেন, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল যদি ইসরাইলের দখলে চলে যায়, তবে দেশের সার্বভৌমত্বই অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। বার্তা সংস্থা মেহেরের বরাতে এই তথ্য জানা গেছে।

শেখ নাইম কাসেম তার বক্তব্যে বলেন, লেবাননের বিরুদ্ধে ইসরাইলি আগ্রাসন কোনো নতুন ঘটনা নয়। যুদ্ধবিরতি চুক্তি সত্ত্বেও এই আগ্রাসন থামেনি, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা আরও জোরালো হয়েছে। তার মতে, এই বাস্তবতায় লেবাননের সামনে দুটি পথ খোলা আছে—একটি হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে দেশের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে তুলে দেওয়া, আর অন্যটি হলো জাতিগত ও রাজনৈতিক বিভাজন ভুলে গিয়ে সার্বভৌমত্ব ও ভূমি রক্ষায় ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, হিজবুল্লাহ দ্বিতীয় পথেই বিশ্বাস করে এবং লেবাননের জনগণও শেষ পর্যন্ত এই পথই বেছে নেবে।

হিজবুল্লাহ মহাসচিব বলেন, যুদ্ধবিরতি চুক্তির মূল শর্ত ছিল পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং বন্দিদের মুক্তি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, লেবানন একের পর এক ছাড় দিলেও ইসরাইল তাদের আগ্রাসন অব্যাহত রেখেছে। আকাশসীমা লঙ্ঘন, সীমান্তবর্তী এলাকায় স্থল অভিযান এবং উপকূলে নৌ তৎপরতার মাধ্যমে ইসরাইল লেবাননের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। কাসেমের ভাষায়, এসব আগ্রাসন কেবল একটি সংগঠন বা একটি অঞ্চলের বিরুদ্ধে নয়, বরং পুরো লেবাননের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে।

তিনি আরও বলেন, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণের যে আলোচনা আন্তর্জাতিক মহলে শোনা যাচ্ছে, তা মূলত একটি ইসরাইল-মার্কিন প্রকল্প। এই প্রকল্পের লক্ষ্য লেবাননের প্রতিরোধ সক্ষমতাকে দুর্বল করা, যাতে ভবিষ্যতে ইসরাইল সহজেই নিজের স্বার্থ বাস্তবায়ন করতে পারে। কাসেমের মতে, এই নিরস্ত্রীকরণ লেবাননের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে না, বরং দেশকে আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে। তিনি বলেন, প্রতিরোধ শক্তি ছাড়া লেবানন কখনোই নিজের ভূখণ্ড ও জনগণকে রক্ষা করতে পারবে না।

শেখ নাইম কাসেম তার বক্তব্যে অতীতের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, অতীতে যখনই লেবানন দুর্বল হয়েছে বা অভ্যন্তরীণ বিভক্তিতে জড়িয়েছে, তখনই বাইরের শক্তি সেই সুযোগ নিয়েছে। তার মতে, দক্ষিণ লেবানন যদি একবার হারিয়ে যায়, তাহলে তা শুধু একটি ভৌগোলিক ক্ষতি হবে না; বরং তা গোটা দেশের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে। তিনি বলেন, “দক্ষিণ হারালে লেবাননের আর কোনো অংশ নিরাপদ থাকবে না।”

অনুষ্ঠানে উপস্থিত সমর্থকদের উদ্দেশে কাসেম বলেন, এই মুহূর্তটি লেবাননের জন্য একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে—দেশ কি নিজের ভাগ্য নিজেই নির্ধারণ করবে, নাকি বাইরের শক্তির হাতে তা তুলে দেবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, লেবাননের জনগণের মধ্যে যে প্রতিরোধের চেতনা রয়েছে, তা কখনো নিঃশেষ হবে না। হিজবুল্লাহ সেই চেতনার প্রতিনিধিত্ব করে বলেই তারা কোনো চাপের কাছে মাথা নত করবে না।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শেখ নাইম কাসেমের এই বক্তব্য শুধু হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক অবস্থানই তুলে ধরে না, বরং লেবাননের ভেতরের চলমান রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকটের প্রতিফলনও ঘটায়। একদিকে রয়েছে অর্থনৈতিক দুরবস্থা, অন্যদিকে সীমান্ত উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক চাপ। এই প্রেক্ষাপটে হিজবুল্লাহ নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে এবং একই সঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তিকে পাশে টানার চেষ্টা করছে।

লেবাননের ভেতরে হিজবুল্লাহর অবস্থান নিয়ে মতভেদ থাকলেও ইসরাইলি আগ্রাসনের প্রশ্নে দেশটির বড় একটি অংশ ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে যে, সীমান্ত পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে তা সরাসরি তাদের জীবনে প্রভাব ফেলবে। দক্ষিণাঞ্চলের বাসিন্দারা নিয়মিত আকাশসীমা লঙ্ঘন ও গোলাবর্ষণের খবর দিচ্ছেন, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, লেবানন-ইসরাইল সীমান্ত পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই অস্থিতিশীল। যুদ্ধবিরতি চুক্তি থাকলেও তা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উভয় পক্ষের মধ্যে অবিশ্বাস বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে হিজবুল্লাহর মহাসচিবের বক্তব্য ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি কোন দিকে যেতে পারে, তার একটি ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলছে, যেকোনো ধরনের সামরিক উত্তেজনার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয় সাধারণ মানুষ। তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, যেন লেবানন ও ইসরাইল উভয় পক্ষকে সংযম দেখাতে এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে বাধ্য করা হয়। একই সঙ্গে তারা লেবাননের সার্বভৌমত্ব রক্ষার অধিকারও স্বীকার করার কথা বলছে।

সব মিলিয়ে, শেখ নাইম কাসেমের এই বক্তব্য লেবাননের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আত্মসমর্পণ নয়, বরং ঐক্য ও প্রতিরোধ—এই বার্তাই তিনি তুলে ধরেছেন। সামনে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা অনেকটাই নির্ভর করবে আঞ্চলিক রাজনীতি, আন্তর্জাতিক চাপ এবং লেবাননের ভেতরের ঐক্যের ওপর। তবে হিজবুল্লাহর মহাসচিবের কণ্ঠে উচ্চারিত দৃঢ় অবস্থান এটুকু স্পষ্ট করে দিয়েছে, তারা ইসরাইলের বিরুদ্ধে অবস্থান থেকে একচুলও সরে আসতে প্রস্তুত নয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত