আমিরাতের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি বাতিল করল ইয়েমেন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৮৫ বার
আমিরাতের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি বাতিল করল ইয়েমেন

প্রকাশ: ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনার পারদ চড়িয়েছে ইয়েমেনের সাম্প্রতিক ঘোষণা। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে বিদ্যমান যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে ইয়েমেন সরকার। একইসঙ্গে দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে এবং ইয়েমেনের ভূখণ্ডে অবস্থানরত আমিরাতি বাহিনীকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল জাজিরাসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান রাশাদ আল-আলিমি টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে এই ঘোষণা দেন। ভাষণে তিনি বলেন, ইয়েমেনের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থেই এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আল-আলিমি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘সংযুক্ত আরব আমিরাতের সব সামরিক বাহিনীকে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইয়েমেনের সমস্ত ভূখণ্ড থেকে সরে যেতে হবে। এই নির্দেশ অমান্য করা হলে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তার ভাষণে আরও জানানো হয়, আজ থেকেই ৯০ দিনের জন্য ইয়েমেনজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের সব বন্দর ও সীমান্ত ক্রসিংয়ে ৭২ ঘণ্টার জন্য বিমান ও স্থলপথে চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং যেকোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা প্রতিরোধ করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েমেনের এই সিদ্ধান্তের পেছনে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া একাধিক সামরিক ও রাজনৈতিক ঘটনার সরাসরি প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের মুকাল্লা বন্দরে চালানো বিমান হামলার পর পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। এই হামলায় লক্ষ্যবস্তু ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল বা এসটিসির জন্য পাঠানো সামরিক সহায়তা।

সৌদি প্রেস এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার ভোরে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নগরী মুকাল্লায় বিমান হামলা চালায়। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, ভ্রাতৃপ্রতিম রাষ্ট্র সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেওয়া কিছু পদক্ষেপ অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং তা ইয়েমেন সংকটকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। বিবৃতিতে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষার আহ্বান জানানো হলেও ঘটনাপ্রবাহে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, মিত্রদের মধ্যেই এখন মতপার্থক্য তীব্র আকার ধারণ করেছে।

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালকি জানান, গত শনিবার ও রোববার জোটের অনুমোদন ছাড়াই দুটি জাহাজ মুকাল্লা বন্দরে প্রবেশ করে। এসব জাহাজ নিজেদের ট্র্যাকিং সিস্টেম বন্ধ করে বন্দরে নোঙর করে এবং এসটিসিকে সহায়তা দেওয়ার জন্য বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও যুদ্ধযান খালাস করে। জোটের মতে, এই কর্মকাণ্ড ইয়েমেন সংকট নিরসনে চলমান প্রচেষ্টাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করেছে।

ইয়েমেন সরকার দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে যে, সংযুক্ত আরব আমিরাত দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করছে এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে মদদ দিচ্ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ ইয়েমেনে সক্রিয় এসটিসির সঙ্গে আমিরাতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনায় সেই অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান আল-আলিমি তার ভাষণে বলেন, ইয়েমেন কারও প্রভাব বলয়ে পরিণত হবে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘আমাদের দেশ বহু বছর ধরে যুদ্ধ, বিভক্তি ও বিদেশি হস্তক্ষেপের শিকার। এখন সময় এসেছে ইয়েমেনিদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করার।’ তার এই বক্তব্য দেশটির ভেতরে জাতীয়তাবাদী অনুভূতিকে উসকে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ইয়েমেনের এই ঘোষণার পর আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মহলে প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক অঙ্গনে বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেন যুদ্ধে একই জোটে থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তাদের কৌশলগত স্বার্থে পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইয়েমেন সরকারের এই কঠোর অবস্থান সেই বিভাজনকে আরও প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে।

মানবিক দিক থেকেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। ইয়েমেন এমনিতেই বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। যুদ্ধ, খাদ্যাভাব ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভঙ্গুরতার কারণে লাখ লাখ মানুষ দুর্ভোগে পড়েছে। নতুন করে জরুরি অবস্থা ও সীমান্ত বন্ধের সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের জীবনে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন মানবাধিকারকর্মীরা।

তবে ইয়েমেন সরকার বলছে, এই সিদ্ধান্ত সাময়িক এবং দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জরুরি অবস্থার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সামরিক বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করবে, যাতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখা যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেই নয়, বরং পুরো অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। এটি ইয়েমেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ গতিপথকেও নতুন করে নির্ধারণ করতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

সব মিলিয়ে, ইয়েমেনের এই ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির রাজনৈতিক বাস্তবতায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। আগামী দিনগুলোতে আমিরাত, সৌদি আরব এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিক্রিয়া কী হয়, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি এখন ইয়েমেনের দিকে, যেখানে একটি সিদ্ধান্ত পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত