প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নতুন বছরের প্রথম দিনেই রাজশাহীতে ঘটে গেল হৃদয়বিদারক সড়ক দুর্ঘটনা। বালু ভর্তি একটি ট্রাক উল্টে চারজন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন আরও একজন। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে পুঠিয়া উপজেলার জলমলিয়া বাজার এলাকায় এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে ব্যস্ত সড়ক পরিণত হয় শোকের স্থানে, থমকে যায় স্বাভাবিক জনজীবন। স্থানীয়দের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনা আবারও দেশের সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও উদ্ধারকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সকালবেলায় বাজারকেন্দ্রিক এলাকায় যানবাহনের চলাচল স্বাভাবিক ছিল। ঠিক তখনই দ্রুতগতিতে আসা বালুবাহী ট্রাকটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশে উল্টে যায়। ভারী বালুর চাপেই ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই চারজনের মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত একজনকে উদ্ধার করে দ্রুত নিকটবর্তী হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যেই, ৭টা ৫৫ মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায় উদ্ধারকারী দল। তারা স্থানীয়দের সহযোগিতায় ট্রাকের নিচে চাপা পড়া ব্যক্তিদের উদ্ধার করেন। তবে ততক্ষণে চারজনের প্রাণ নিভে গেছে। উদ্ধার তৎপরতার সময় এলাকায় শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়, অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, জলমলিয়া বাজার এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে পরিচিত। বাজার, পথচারী ও ভারী যানবাহনের একসঙ্গে চলাচলের কারণে প্রায়ই ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটে। তবে এত বড় প্রাণহানির ঘটনা এলাকাবাসীকে হতবাক করে দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, বালুবাহী ও পণ্যবাহী ট্রাকগুলো প্রায়ই অতিরিক্ত গতিতে এবং অতিরিক্ত বোঝা নিয়ে চলাচল করে। তদারকির অভাবে এমন দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে।
দুর্ঘটনার পরপরই সড়কের দুই পাশে যানজটের সৃষ্টি হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান চলাচল স্বাভাবিক করতে কাজ শুরু করে। ট্রাকটি সরিয়ে নেওয়ার পর কয়েক ঘণ্টা পর সড়কে স্বাভাবিক গতি ফিরে আসে। নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
রাজশাহী অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে ভারী যানবাহনের সঙ্গে জড়িত দুর্ঘটনায় প্রাণহানি বেশি হচ্ছে। সড়ক পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, অনিয়ন্ত্রিত গতি, অদক্ষ চালক, অতিরিক্ত মাল বোঝাই এবং সড়কের কাঠামোগত দুর্বলতা এসব দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। জলমলিয়া বাজার এলাকার মতো জনবহুল স্থানে ভারী ট্রাক চলাচলের জন্য আলাদা সময়সূচি বা বিকল্প পথ নির্ধারণ না থাকাও ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
দুর্ঘটনায় নিহতদের স্বজনরা সংবাদ পেয়ে হাসপাতালে ও ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। অনেকেই বলছেন, পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে তারা দিশেহারা। নতুন বছরের প্রথম দিনেই এমন শোক তাদের জীবনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা নিহত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তার কথা জানিয়েছেন।
এদিকে পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু হয়েছে। ট্রাকটির যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল কি না, চালকের লাইসেন্স ও ফিটনেস বৈধ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, দ্রুতগতি ও নিয়ন্ত্রণ হারানোই দুর্ঘটনার মূল কারণ। তবে তদন্ত শেষে বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, প্রতিটি বড় দুর্ঘটনার পর কিছুদিন আলোচনা হলেও কার্যকর পদক্ষেপ খুব কমই নেওয়া হয়। ফলে একই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে। তারা মনে করেন, শুধু আইন প্রয়োগ নয়, চালকদের প্রশিক্ষণ, যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি বাড়ানো জরুরি। বাজার ও জনবহুল এলাকায় ভারী যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে কঠোর সিদ্ধান্ত না নিলে প্রাণহানি কমানো সম্ভব নয়।
রাজশাহীর এই দুর্ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দিল, সড়কে সামান্য অবহেলাও কত বড় ট্র্যাজেডির জন্ম দিতে পারে। চারটি পরিবারের জীবনে নেমে এসেছে চরম শোক, আহত একজন জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন। নতুন বছরের সূচনালগ্নে এই ঘটনা দেশের সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবার তাগিদ দিচ্ছে। জনসচেতনতা, প্রশাসনিক তৎপরতা ও কঠোর নজরদারি—সব মিলিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এমন দুর্ঘটনা রোধ করা কঠিন বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।