প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বছরের শুরুতেই একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটালেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরে প্রথমবারের মতো ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করে তিনি স্পষ্ট করে দিলেন—নীতিনির্ধারণে আপসের জায়গা খুব সীমিত। এ সপ্তাহে তিনি কংগ্রেসে দ্বিদলীয় সমর্থনে পাস হওয়া দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিল বাতিল করেছেন, যা ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে এই দুটি বিলে ভেটো দেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
বাতিল হওয়া বিল দুটির একটি ছিল পানি সরবরাহ সংক্রান্ত বড় প্রকল্প, অন্যটি ছিল আদিবাসী সংরক্ষিত এলাকার নিয়ন্ত্রণ ও সম্প্রসারণ সংক্রান্ত। উভয় বিলই ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—দুই দলের সমর্থন পেয়েছিল, যা সাধারণত প্রেসিডেন্টের ভেটো প্রয়োগকে রাজনৈতিকভাবে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে কংগ্রেস ও প্রশাসনের মধ্যে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক এবং আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া কীভাবে এগোবে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা।
হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট মনে করেন, এই দুটি বিল যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে। তাঁর ভাষায়, তিনি এমন কোনো প্রকল্পে অনুমোদন দিতে চান না, যা “অতিরিক্ত ব্যয়বহুল, অনিশ্চিত ফলপ্রসূ এবং জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।” এই বক্তব্যের মধ্য দিয়েই ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের শাসনদর্শনের একটি আভাস দিয়েছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
প্রথম যে বিলটিতে ভেটো দেওয়া হয়েছে, সেটির নাম ‘ফিনিশ দ্য আরকানসাস ভ্যালি কন্ডুইট অ্যাক্ট’। এই বিলের লক্ষ্য ছিল কলোরাডোর ইস্টার্ন প্লেইন্স অঞ্চলে দীর্ঘদিনের একটি পানি সরবরাহ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা। প্রকল্পটি স্থানীয় কৃষক, বাসিন্দা ও শিল্পখাতের জন্য নিরাপদ ও স্থায়ী পানির উৎস নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে প্রস্তাব করা হয়েছিল। বিলটির পক্ষে যুক্তি ছিল—এই অঞ্চলে পানির সংকট বহুদিনের, যা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলছে।
তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই যুক্তির সঙ্গে একমত হননি। ভেটো বার্তায় তিনি উল্লেখ করেন, প্রকল্পটির ব্যয় অত্যন্ত বেশি এবং এর বাস্তবায়ন নিয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে। তাঁর মতে, এটি ‘আমেরিকান করদাতাদের জন্য একটি ব্যয়বহুল ও অবিশ্বস্ত নীতি’। তিনি আরও বলেন, সীমিত সরকারি সম্পদ এমন প্রকল্পে ব্যয় করা উচিত, যেগুলোর সুফল দ্রুত ও নিশ্চিতভাবে জনগণের কাছে পৌঁছাবে। এই মন্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রেও তিনি ব্যয়সংকোচন ও লাভ-ক্ষতির হিসাবকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
দ্বিতীয় যে বিলটি বাতিল হয়েছে, সেটি আরও বেশি সংবেদনশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুর সঙ্গে যুক্ত। ‘মিকোসুকি রিজার্ভড এরিয়া অ্যামেন্ডমেন্টস অ্যাক্ট’ নামের এই বিলটি ফ্লোরিডার এভারগ্লেডস ন্যাশনাল পার্কের ওসিওলা ক্যাম্প এলাকায় মিকোসুকি আমেরিকান আদিবাসী গোত্রের নিয়ন্ত্রণ ও অধিকার সম্প্রসারণের প্রস্তাব দিয়েছিল। সমর্থকদের মতে, এটি ছিল ঐতিহাসিক অবিচার সংশোধনের একটি পদক্ষেপ, যা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ও ভূমিগত অধিকারকে স্বীকৃতি দিত।
কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই প্রস্তাবের কড়া বিরোধিতা করেন। ভেটো ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, তিনি কখনোই এমন কিছু অনুমোদন দেবেন না, যার মাধ্যমে মিকোসুকি গোত্র ওই এলাকায় বসবাস বা স্থায়ী নিয়ন্ত্রণের অধিকার পায়। তাঁর মতে, এই ধরনের উদ্যোগ বিশেষ স্বার্থগোষ্ঠীকে সুবিধা দেয় এবং করদাতাদের অর্থ এমন প্রকল্পে ব্যয় করে, যা তাঁর প্রশাসনের অভিবাসন ও ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই বক্তব্য ইতোমধ্যে মানবাধিকার সংগঠন ও আদিবাসী অধিকারকর্মীদের সমালোচনার মুখে পড়েছে।
মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের ভেটো অগ্রাহ্য করতে হলে কংগ্রেসের দুই কক্ষ—সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিলগুলো পুনরায় পাস করতে হয়। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এমন সমর্থন জোগাড় করা কঠিন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ফলে ট্রাম্পের এই ভেটো কার্যত বিল দুটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তুলেছে।
প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য রক্ষাকারী উপাদান হলেও, এটি তুলনামূলকভাবে কম ব্যবহৃত হয়। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তিনি মোট ১০টি বিলে ভেটো দিয়েছিলেন। তার বিপরীতে তাঁর পূর্বসূরি জো বাইডেন চার বছরের মেয়াদে ১৩টি বিলে ভেটো প্রয়োগ করেন। এই পরিসংখ্যান দেখায়, ভেটো প্রয়োগ যদিও বিরল, তবুও প্রয়োজন হলে প্রেসিডেন্টরা এই ক্ষমতা ব্যবহার করতে পিছপা হন না।
দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ভেটো প্রয়োগ করে ট্রাম্প রাজনৈতিকভাবে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন বলে মনে করছেন ওয়াশিংটনের পর্যবেক্ষকরা। তাঁদের মতে, এটি কংগ্রেসের উদ্দেশে একটি ইঙ্গিত—প্রশাসনের নীতিগত সীমার বাইরে গিয়ে কোনো বিল পাস করলেই তা অনুমোদন পাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ফলে আগামী দিনগুলোতে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় আরও কঠোর দরকষাকষি ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন দেখা যেতে পারে।
এই ভেটো সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজরও কেড়েছে। কারণ, ট্রাম্পের নীতি ও সিদ্ধান্ত প্রায়ই বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে থাকে। বিশ্লেষকদের মতে, দ্বিতীয় মেয়াদে তাঁর প্রশাসন আরও আত্মবিশ্বাসী ও আক্রমণাত্মক নীতি গ্রহণ করতে পারে, যার প্রভাব কেবল যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতিতেও পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, দ্বিতীয় মেয়াদে প্রথমবার ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মঞ্চে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছেন। এই সিদ্ধান্ত শুধু দুটি বিল বাতিলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ভবিষ্যৎ কংগ্রেসি আলোচনা, প্রশাসন-কংগ্রেস সম্পর্ক এবং জাতীয় নীতিনির্ধারণের গতিপথে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।