প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় ঐতিহাসিক শহর আলেপ্পোতে নববর্ষের আনন্দমুখর মুহূর্তে নেমে আসে আতঙ্ক ও শোক। বুধবার গভীর রাতে আত্মঘাতী বিস্ফোরণে এক পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন। সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, নববর্ষ উদ্যাপন ঘিরে নিরাপত্তা জোরদারের অংশ হিসেবে দায়িত্ব পালনরত অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর একটি প্যাট্রল টিম এই হামলার মুখে পড়ে। দেশজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্যেই এই ঘটনা নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে—সিরিয়ায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো কতটা নাজুক।
রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সানা জানিয়েছে, আলেপ্পোর আল-ফারাজ প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় নিরাপত্তা টহলের সময় একটি সন্দেহজনক ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। ওই ব্যক্তি বিস্ফোরকবাহী বলে সন্দেহ হওয়ায় তাকে আটক করার চেষ্টা করা হয়। ঠিক সেই মুহূর্তেই তিনি নিজের শরীরে থাকা বিস্ফোরক বেল্ট বিস্ফোরিত করেন। বিস্ফোরণের তীব্রতায় ঘটনাস্থল কেঁপে ওঠে এবং তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে দায়িত্বরত এক পুলিশ কর্মকর্তা প্রাণ হারান। আহত হন আরও কয়েকজন নিরাপত্তা সদস্য ও পথচারী।
আলেপ্পোর গভর্নর আযযাম আল-ঘারিব এক বিবৃতিতে বলেন, নববর্ষ উদ্যাপনের কারণে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা মোতায়েন করা হয়েছিল। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা সন্দেহভাজন ওই ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে তৎপরতা শুরু করেন। গভর্নর জানান, “একজন পুলিশ কর্মকর্তা তাকে শারীরিকভাবে রোধ করতে সক্ষম হন। ঠিক সেই সময়ই ওই ব্যক্তি তার বিস্ফোরক বেল্টটি বিস্ফোরণ ঘটান।” গভর্নরের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ সদস্যের সাহসী পদক্ষেপের কারণে বড় ধরনের হতাহতের ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
বিস্ফোরণের পরপরই পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে নিরাপত্তা বাহিনী। আশপাশের সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং উদ্ধার তৎপরতা শুরু হয়। আহতদের দ্রুত নিকটবর্তী হাসপাতালে নেওয়া হয়। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হলেও অধিকাংশই স্থিতিশীল আছেন। চিকিৎসকরা জানান, বিস্ফোরণের ধাক্কা ও ধ্বংসাবশেষের আঘাতে আহতরা বিভিন্ন মাত্রার ক্ষতির শিকার হয়েছেন।
সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র নূর আল-দিন আল-বাবা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক বক্তব্যে বলেন, হামলাকারী সম্ভবত একটি খ্রিস্টান অধ্যুষিত এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করছিল, যেখানে একাধিক গির্জা ও উপাসনালয় রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নববর্ষ উপলক্ষে ওই এলাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হওয়ার কথা ছিল। নিরাপত্তা বাহিনীর দ্রুত পদক্ষেপের কারণেই বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো গেছে বলে দাবি করেন তিনি।
নববর্ষকে কেন্দ্র করে সিরিয়ার বিভিন্ন শহরে, বিশেষ করে আলেপ্পো, দামেস্ক ও হোমসে, নিরাপত্তা ব্যবস্থা আগেই জোরদার করা হয়েছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুদ্ধের তীব্রতা কিছুটা কমলেও বিচ্ছিন্ন হামলার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। বিশেষ করে ধর্মীয় ও উৎসবকেন্দ্রিক জমায়েতগুলোকে লক্ষ্য করে হামলার ঝুঁকি থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্কতায় ছিল।
আলেপ্পোর বাসিন্দারা জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের শব্দ এতটাই শক্তিশালী ছিল যে আশপাশের ভবন কেঁপে ওঠে। অনেকেই ভয়ে ঘর থেকে বের হতে সাহস পাননি। একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “নববর্ষের রাতে আমরা আনন্দের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। হঠাৎ বিকট শব্দে সব আনন্দ মুহূর্তে আতঙ্কে পরিণত হয়।” শহরের রাস্তায় আতশবাজির আলো আর উৎসবের গান থেমে গিয়ে জায়গা নেয় সাইরেনের শব্দ ও নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতা।
এই হামলার জন্য এখন পর্যন্ত কোনো গোষ্ঠী দায় স্বীকার করেনি। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সিরিয়ায় সক্রিয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো এখনো সুযোগ পেলেই নিরাপত্তা বাহিনী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর চেষ্টা করছে। বিশেষ করে উৎসবের সময় মানুষের জমায়েতকে তারা সহজ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করে থাকে।
গত এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা গৃহযুদ্ধ সিরিয়াকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। যদিও অনেক এলাকায় যুদ্ধের তীব্রতা কমেছে এবং পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে, তবুও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ পুরোপুরি কাটেনি। আলেপ্পো, যা একসময় সিরিয়ার বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র ছিল, যুদ্ধের সময় ব্যাপক ধ্বংসের মুখে পড়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শহরটি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছে। নববর্ষ উদ্যাপনকে ঘিরে মানুষের মধ্যে কিছুটা আশার সঞ্চার হলেও এই হামলা সেই আশাকে আবারও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিল।
নিহত পুলিশ কর্মকর্তার সহকর্মীরা তাকে সাহসী ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তার আত্মত্যাগকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান জানানো হবে বলে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে। গভর্নর আযযাম আল-ঘারিব বলেন, “তিনি তার জীবনের বিনিময়ে বহু মানুষের জীবন রক্ষা করেছেন। তার এই আত্মত্যাগ আমরা কখনো ভুলব না।”
এই ঘটনার পর সিরিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী দেশজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছে। বিশেষ করে ধর্মীয় স্থাপনা, পর্যটন এলাকা ও জনসমাগমস্থলে অতিরিক্ত টহল ও নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। পাশাপাশি হামলাকারীর পরিচয় ও পেছনের নেটওয়ার্ক শনাক্তে তদন্ত শুরু হয়েছে।
নববর্ষের আনন্দের মাঝেই আলেপ্পোর এই আত্মঘাতী হামলা সিরিয়ার বাস্তবতাকে আবারও সামনে এনে দিয়েছে। যুদ্ধের ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই এমন ঘটনা সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে ভয় ও শঙ্কা তৈরি করেছে। তবুও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের তৎপরতা ও আত্মত্যাগে অনেকেই আশাবাদী—সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হয়ে থাকবে।