ইরানে বিক্ষোভ: প্রেসিডেন্টের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৭৩ বার
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান

প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরানে অর্থনৈতিক সংকট, মুদ্রাবাজারে ধস এবং ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। এসব বিক্ষোভের মধ্যে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার জন্য বিদেশি হস্তক্ষেপ দায়ী এবং দেশি জনগণকে একসঙ্গে থাকলে কোনো শত্রু ইরানকে পতিত করতে পারবে না।

তেহরানে একটি ব্যবসায়িক ফোরামে দেওয়া বক্তব্যে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘আমরা এমন একটি পরিস্থিতিতে আছি যেখানে দেশের শত্রুরা চাপ প্রয়োগ করছে। তারা অর্থনৈতিক অস্ত্র ব্যবহার করে আমাদের পতন ঘটাতে চাইছে। বোমা, যুদ্ধবিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আপনি কোনো জাতিকে জয় করতে পারবেন না। যদি আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, ঐক্যবদ্ধ ও একসাথে কাজ করি, তাহলে তাদের পক্ষে ইরানকে নতজানু করা অসম্ভব হবে।’

ইরানের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ২০১৮ সালে পুনরায় মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর দেশটির বাণিজ্য, রপ্তানি ও মুদ্রা বাজার তীব্র আঘাত পেয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম মেয়াদে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে সরে যান। এরপর ইউরোপীয় দেশগুলোও জাতিসংঘের মাধ্যমে ২০১৫ সালের চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগে ইরানের ওপর নানা পদক্ষেপ নেয়। একই সঙ্গে ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার চেষ্টা চালিয়েছিল, যদিও ইরান বরাবরই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কথা অস্বীকার করেছে।

২০২৫ সালে ইরানের মুদ্রা রিয়ালের মান ডলারের বিপরীতে প্রায় অর্ধেক কমে যায়। ডিসেম্বর পর্যন্ত মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছায়, যা সাধারণ জনগণের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রাকে তীব্রভাবে প্রভাবিত করেছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারের নীতিগত ব্যর্থতা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। দক্ষিণাঞ্চলীয় ফারস প্রদেশের ফাসা শহরে বিক্ষোভকারীরা স্থানীয় প্রশাসনিক ভবনের গেট ভেঙে প্রবেশের চেষ্টা করেন, ফলে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়।

প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলছেন, দেশের জনগণকে এই কঠিন পরিস্থিতিতে একসাথে থাকার মাধ্যমে যে কোনো বহিরাগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। তিনি আরও বলেন, ‘এই মুহূর্তে শত্রুরা অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে আমাদের পতন ঘটাতে চাইছে। আমাদের ঐক্য এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞতা ছাড়া তাদের পরিকল্পনা কার্যকর করা সম্ভব নয়।’

বিক্ষোভ ও হরতাল পরিস্থিতির কারণে রাজধানী তেহরানসহ দেশের বিভিন্ন শহরে স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ব্যাংক ও অন্যান্য অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানও সময়কালীনভাবে বন্ধ থাকে। সরকার এই পদক্ষেপকে শীতের তীব্রতায় জ্বালানি সাশ্রয়ের প্রয়াস হিসেবে দেখালেও সাধারণ মানুষ মনে করছেন, এটি বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের কৌশল।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ফাসা ও অন্যান্য শহরে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হচ্ছে। বিক্ষোভের সময় কমপক্ষে একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন এবং কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়েছেন। পশ্চিমাঞ্চলীয় লোরেস্তান প্রদেশে কমপক্ষে একজন আধাসামরিক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। এর ফলে ইরানজুড়ে পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতারও প্রতিফলন। সরকারের প্রতি মানুষের ক্ষোভ, উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়, মুদ্রার মানহ্রাস এবং বৈদেশিক চাপ মিলিত হয়ে বিপুল বিক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। প্রেসিডেন্টের আহ্বান অনুসারে দেশের জনগণকে একসাথে দাঁড়াতে হবে, যাতে বহিরাগত চাপ ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার মোকাবিলা সম্ভব হয়।

ইরান জুড়ে বিক্ষোভের ফলে দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা ও জনজীবন মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। বহু শহরে যানজট, ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাঘাত এবং নিরাপত্তা জোরদার করার কারণে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, বিদেশি হস্তক্ষেপ ও অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় দেশের ঐক্য অপরিহার্য। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও জনগণকে এই ঐক্যবদ্ধতার প্রতিশ্রুতি দিতে আহ্বান জানিয়েছেন।

পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদেরও উদ্বিগ্ন করেছে। ইরানের বিক্ষোভ ও মুদ্রাস্ফীতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রভাবিত হচ্ছে। দেশটির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নীতি নিয়ন্ত্রনে রাখতে বিদেশি অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ, অভ্যন্তরীণ সমন্বয় এবং জনগণের ঐক্য অপরিহার্য বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

প্রেসিডেন্টের আহ্বান ও দেশের সাধারণ জনগণের প্রতিবাদ যে কোনো অর্থনৈতিক চাপ ও বৈদেশিক হস্তক্ষেপ মোকাবিলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা হিসেবে ধরা হচ্ছে। সরকারের দাবি অনুযায়ী, দেশজুড়ে ঐক্যবদ্ধ জনগণই ইরানের স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত