প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইংরেজি নববর্ষের প্রাক্কালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আবারও স্পষ্টভাবে ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি তাইওয়ানকে চীনের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে পুনরায় একত্রিত করতে অপ্রতিরোধ্যভাবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। বেইজিং থেকে দেওয়া তার বাৎসরিক ভাষণে শি জোর দিয়ে বলেন, মাতৃভূমির পুনঃএকত্রীকরণ বর্তমান সময়ের চাহিদা এবং অবশ্যম্ভাবী, এবং তাইওয়ানকে চীনের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা বেইজিংয়ের প্রধান লক্ষ্য।
শি জিনপিংয়ের এই হুঁশিয়ারি আসে এমন সময়, যখন চীন সম্প্রতি তাইওয়ানের চারপাশে ‘জাস্টিস মিশন ২০২৫’ নামে বৃহৎ সামরিক মহড়া সম্পন্ন করেছে। এক বছরের মধ্যে এটি সবচেয়ে বড় মহড়া হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যেখানে অন্তত ৮৯টি যুদ্ধবিমান অংশ নিয়েছিল। মহড়ার সময় তাইওয়ানের প্রধান বন্দরগুলো অবরোধের অনুশীলনও করা হয়। এই সামরিক মহড়া এবং চীনের রাজনৈতিক ভাষণ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের কাছে রেকর্ড ১১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, শি জিনপিং প্রয়োজন মনে করলে তাইওয়ানে সামরিক অভিযান চালাতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত চীন-তাইওয়ান উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে এবং পূর্ব এশিয়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কা জাগিয়েছে।
শি জিনপিং তার ভাষণে সাংহাই কো-অপারেশন সামিটের কথাও উল্লেখ করেছেন, যেখানে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের ৮০ বছরের পূর্তি উপলক্ষে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত বিশাল সামরিক কুচকাওয়াজের ফুটেজও প্রদর্শন করেন, যেখানে রাশিয়ার পুতিন এবং উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন উপস্থিত ছিলেন। শি এই কুচকাওয়াজকে একটি শক্তিশালী বার্তা হিসেবে তুলে ধরেছেন যে, চীনের সামরিক সক্ষমতা অত্যন্ত শক্তিশালী।
শি জিনপিং তার ভাষণে চীনা অর্থনীতির অগ্রগতির কথাও তুলে ধরেন। তিনি জানান, দেশটি ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে রয়েছে। প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান ক্ষেত্রে চীনের অগ্রগতি, যেমন কিকবক্সিং রোবট এবং মহাকাশ অভিযানের সাফল্য, আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় চীনের অবস্থান শক্তিশালী করছে। তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে তাইওয়ানকে চীনের সঙ্গে একত্রিত করার হুঁশিয়ারি উত্তেজনার সৃষ্টিকারী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে চীনের এই দাবির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। তিনি তাইওয়ানের বর্তমান পরিস্থিতি তুলনা করেছেন ১৯৩০-এর দশকের ইউরোপের সঙ্গে, যখন নাৎসি জার্মানি হুমকির মুখে ছিল। তিনি বলেন, তাইওয়ান স্বাধীন ও সুরক্ষিত থাকতেই চীনের সামরিক হুমকি মোকাবিলা করবে। এই দ্বিধাহীন প্রতিক্রিয়া আন্তর্জাতিক মহলে চীনের ওপর চাপ তৈরি করেছে এবং পূর্ব এশিয়ায় সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শি জিনপিংয়ের ভাষণ ও সামরিক মহড়া পূর্ব এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তাইওয়ানকে চীনের সঙ্গে একত্রিত করার শি জিনপিংয়ের লক্ষ্য আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো চীনের সামরিক কর্মকাণ্ডে উদ্বিগ্ন। এ সময় চীনের প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামরিক শক্তি প্রদর্শন এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্ক শি জিনপিংয়ের বার্তাকে আরও সুসংগত করেছে।
অপরদিকে, তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে শি জিনপিংয়ের হুঁশিয়ারি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, স্বাধীনতার প্রতি তাইওয়ানের জনগণের অঙ্গীকার দৃঢ়। তিনি বলেন, তাইওয়ানকে জোরপূর্বক চীনের সঙ্গে একত্রিত করার চেষ্টা অঞ্চলটিতে অস্থিতিশীলতা বাড়াবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও শান্তির জন্য হুমকি সৃষ্টি করবে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শি জিনপিংয়ের এই পদক্ষেপ ও ভাষণ চীন-তাইওয়ান সম্পর্কের উত্তেজনাকে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। সামরিক মহড়া, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বার্তা এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রভাব একত্রিত হয়ে চীনের প্রতিরক্ষা এবং রাজনৈতিক অবস্থান দৃঢ় করছে। তবে তাইওয়ান নিজের স্বাধীনতা রক্ষা ও আন্তর্জাতিক সমর্থন নিশ্চিত করার জন্য প্রতিক্রিয়া অব্যাহত রাখছে, যা পূর্ব এশিয়ার রাজনীতিতে নতুন অস্থিরতা সৃষ্টি করছে।
চীনের এই পদক্ষেপ ও তাইওয়ানের প্রতিক্রিয়ার প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় উদ্বিগ্ন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সামরিক মহড়া, অস্ত্র বিক্রি ও কূটনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি, সব মিলিয়ে পূর্ব এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এই পরিস্থিতি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে অঞ্চলটির জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।