প্রকাশ: ০১ জানুয়ারী ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নতুন বছরের শুরুতেই তুরস্ক ও চীনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্ত হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। তুরস্কের অফিসিয়াল গেজেটে প্রকাশিত এক রাষ্ট্রপতির আদেশ অনুযায়ী, আগামী ২ জানুয়ারি থেকে পর্যটন ও ট্রানজিটের উদ্দেশ্যে তুরস্কে আগত চীনা নাগরিকদের জন্য ভিসা ছাড়াই প্রবেশাধিকার কার্যকর হতে যাচ্ছে। এই সিদ্ধান্ত শুধু দুই দেশের ভ্রমণ ব্যবস্থাকেই সহজ করবে না, বরং পর্যটন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও জনগণভিত্তিক সম্পর্ককে আরও গভীর ও গতিশীল করবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
তুরস্কভিত্তিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম হুরিয়েত ডেইলি নিউজ এক প্রতিবেদনে জানায়, নতুন নিয়ম অনুসারে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের সাধারণ পাসপোর্টধারীরা ভিসা ছাড়াই ১৮০ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ ৯০ দিন পর্যন্ত তুরস্কে অবস্থান করতে পারবেন। অর্থাৎ, ভ্রমণ, ব্যবসা কিংবা আন্তর্জাতিক ট্রানজিটের ক্ষেত্রে চীনা নাগরিকদের আর আলাদা করে ভিসা প্রক্রিয়ার জটিলতার মুখে পড়তে হবে না। ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। চীনা নাগরিকদের জন্য ভিসামুক্ত প্রবেশাধিকার সেই ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বকে আরও সুদৃঢ় করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্ব পর্যটন শিল্পে চীনের অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কোটি কোটি চীনা পর্যটক ভ্রমণ করেন এবং তাদের ব্যয়ক্ষমতা আন্তর্জাতিক পর্যটন অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখে। তুরস্কের পর্যটন খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে দেশটিতে চীনা পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। ইস্তাম্বুলের ঐতিহাসিক মসজিদ ও জাদুঘর, কাপাদোকিয়ার ব্যতিক্রমধর্মী প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, আন্তালিয়ার সমুদ্রসৈকত কিংবা এজিয়ান অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য—সবকিছুই চীনা পর্যটকদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতার দুয়ার খুলে দেবে। এর ফলে হোটেল, পরিবহন, রেস্তোরাঁ ও স্থানীয় ব্যবসায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই ভিসামুক্ত সিদ্ধান্তের মানবিক দিকটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভ্রমণ কেবল অর্থনৈতিক লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষে-মানুষে সংযোগ, সংস্কৃতির আদান-প্রদান এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। চীনা পর্যটকেরা তুরস্কের হাজার বছরের ইতিহাস, ইসলামি ও বাইজেন্টাইন স্থাপত্য, স্থানীয় জীবনধারা ও আতিথেয়তার সঙ্গে পরিচিত হবেন। একইভাবে তুর্কি জনগণও চীনা সংস্কৃতি, ভাষা ও রীতিনীতির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন। দীর্ঘমেয়াদে এই পারস্পরিক যোগাযোগ দুই দেশের জনগণের মধ্যে আস্থা ও বন্ধুত্বকে আরও সুদৃঢ় করবে বলে মনে করছেন সমাজ ও সংস্কৃতি বিশ্লেষকরা।
তুরস্ক ও চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাসও বেশ পুরোনো ও তাৎপর্যপূর্ণ। দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭১ সালে। পরবর্তী কয়েক দশকে ধীরে ধীরে এই সম্পর্ক বিস্তৃত হলেও ২০১০ সালে তা নতুন মাত্রা পায়, যখন দুই দেশ তাদের সম্পর্ককে কৌশলগত সহযোগিতার স্তরে উন্নীত করে। এরপর থেকে রাজনৈতিক সংলাপ, অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পারস্পরিক সমন্বয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশেষ করে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক নতুন গতি পেয়েছে।
গত দুই দশকে তুরস্ক–চীন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০১ সালে যেখানে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল মাত্র ১ বিলিয়ন ডলার, সেখানে ২০২৪ সালে তা ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে রেকর্ড পরিমাণে পৌঁছেছে। এই পরিসংখ্যান দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের গভীরতা ও সম্ভাবনার স্পষ্ট প্রতিফলন। তুরস্ক পরিসংখ্যান ইনস্টিটিউট বা টিইউআইকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে চীনে তুরস্কের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩.৪ বিলিয়ন ডলার, অন্যদিকে চীন থেকে তুরস্কের আমদানির পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৪.৯ বিলিয়ন ডলার। এই বড় বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে তুরস্ক সরকার চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং যৌথ শিল্প উদ্যোগে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে তুরস্ক–চীন সহযোগিতা ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। বৈদ্যুতিক যানবাহন ও সবুজ জ্বালানি খাত বিশ্বব্যাপী যে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেখানে তুরস্ক নিজেকে একটি আঞ্চলিক উৎপাদন ও সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈদ্যুতিক যানবাহন উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালের মজুদ প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য তুরস্ক চীনের সঙ্গে অংশীদারিত্বের পরিকল্পনা করছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে তুরস্কের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বাড়বে।
এই প্রেক্ষাপটেই চীনের শীর্ষস্থানীয় বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বিওয়াইডি ইতোমধ্যে তুরস্কে একটি উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। পাশাপাশি চেরি অটোমোবাইল কোং লিমিটেড, এসএআইসি মোটর কর্পোরেশন এবং গ্রেট ওয়াল মোটর কোং-এর মতো বড় চীনা অটোমোবাইল নির্মাতাদের সঙ্গেও তুরস্ক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এসব বিনিয়োগ শুধু কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে না, বরং প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং শিল্পায়নের মাধ্যমে তুরস্কের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনা নাগরিকদের জন্য ভিসামুক্ত প্রবেশাধিকার এই অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে আরও ত্বরান্বিত করবে। ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও শিল্প উদ্যোক্তারা সহজে যাতায়াত করতে পারলে পারস্পরিক আলোচনা, চুক্তি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি বাড়বে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী, গবেষক ও সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষের জন্যও যোগাযোগ সহজ হবে, যা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও বহুমাত্রিক রূপ দেবে।
তবে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। চীনা পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত ভাষাসেবা, ভ্রমণ তথ্য, নিরাপত্তা ও পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়ন নিশ্চিত করা জরুরি। তুরস্ক সরকার ইতোমধ্যে এসব বিষয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সবকিছু বিবেচনায়, চীনা নাগরিকদের জন্য তুরস্কের ভিসামুক্ত ভ্রমণ সুবিধা একটি সময়োপযোগী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। এটি পর্যটন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করবে। বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় এই উদ্যোগ তুরস্ক ও চীনকে দীর্ঘমেয়াদে আরও ঘনিষ্ঠ ও কার্যকর অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।