সিডনি টেস্টেই শেষ, অবসরের ঘোষণা দিলেন উসমান খাজা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৩ বার
সিডনি টেস্ট খেলেই উসমান খাজার অবসর ঘোষণা

প্রকাশ: ০২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ড—যে মাঠে একদিন শুরু হয়েছিল উসমান খাজার স্বপ্নযাত্রা, সেই মাঠেই নামছে শেষ অধ্যায়ের পর্দা। অ্যাশেজ সিরিজের সিডনি টেস্ট খেলেই আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞ ওপেনার উসমান খাজা। কয়েক দিন ধরেই তার অবসর নিয়ে ক্রিকেট দুনিয়ায় গুঞ্জন চলছিল। টেলিভিশনের টক শো থেকে শুরু করে ক্রিকেট বিশ্লেষকদের আলোচনায় ঘুরে ফিরে আসছিল একটাই প্রশ্ন—খাজা কি শেষবারের মতো মাঠে নামছেন? অবশেষে সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে নিজ মুখেই বিদায়ের সিদ্ধান্ত জানালেন এই বাঁহাতি ব্যাটার।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের ঠিক ১৫ বছর পর নিজের ক্যারিয়ারের ইতি টানছেন খাজা। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম মুসলিম ক্রিকেটার হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিলেন যেখান থেকে, ঠিক সেখানেই শেষ হচ্ছে তার বর্ণাঢ্য টেস্ট ক্যারিয়ার। ২০১০-১১ অ্যাশেজ সিরিজে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডেই হয়েছিল তার টেস্ট অভিষেক। কাকতালীয়ভাবে দেড় দশক পর সেই একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষেই, একই ভেন্যুতে শেষ টেস্ট খেলতে নামছেন তিনি। ক্রিকেট ইতিহাসে এমন আবেগঘন বৃত্ত সম্পূর্ণ হওয়ার গল্প খুব বেশি নেই।

অবসরের ঘোষণা দিতে সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডের সংবাদ সম্মেলন কক্ষে হাজির হয়েছিলেন খাজা, সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী রেচেল ও দুই কন্যা। পরিবারকে পাশে নিয়ে বিদায়ের ঘোষণা দেওয়া ছিল তার জন্য বিশেষ এক মুহূর্ত। সংবাদ সম্মেলনে খাজা বলেন, অবসরের ভাবনা হঠাৎ করে আসেনি। পুরোপুরি নিশ্চিত না হলেও বেশ কিছুদিন ধরেই বিষয়টি তার মাথায় ঘুরছিল। এই অ্যাশেজ সিরিজে আসার সময়ই মনে হচ্ছিল, সম্ভবত এটিই হতে যাচ্ছে তার শেষ আন্তর্জাতিক সিরিজ। অভিজ্ঞ এই ব্যাটার জানান, পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেই তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।

খাজা আরও বলেন, স্ত্রী রেচেলের সঙ্গে অবসর নিয়ে বহুবার কথা হয়েছে। তিনি দরজা পুরোপুরি বন্ধ করে দেননি, কারণ মনে হয়েছিল খেলা চালিয়ে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা হয়তো থেকে যেতে পারে। এমনকি অস্ট্রেলিয়ার প্রধান কোচ অ্যান্ড্রু ম্যাকডোনাল্ডও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আশাবাদী ছিলেন। কয়েক দিন আগে খাজা যখন কোচকে নিজের সিদ্ধান্ত জানান, তখনও ম্যাকডোনাল্ড ভাবছিলেন কীভাবে তাকে ২০২৭ সালের ভারত সফর পর্যন্ত দলে রাখা যায়। কিন্তু নিজের শরীর, মানসিক প্রস্তুতি এবং দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা ভেবেই শেষ পর্যন্ত বিদায়ের পথ বেছে নেন তিনি।

খাজা মনে করেন, নিজের মতো করে বিদায় নিতে পারাটাই তার জন্য সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। মর্যাদা নিয়ে, দর্শকদের ভালোবাসা নিয়ে এবং নিজের প্রিয় মাঠ এসসিজিতেই শেষ করার সুযোগ পাওয়া সৌভাগ্যের। তবে তিনি স্বীকার করেন, এই সিরিজের শুরুটা তার জন্য সহজ ছিল না। প্রথম টেস্টগুলোতে প্রত্যাশিত ছন্দে ছিলেন না। অ্যাডিলেড টেস্টে একাদশে জায়গা না পাওয়ার ঘটনাটি তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। সেই মুহূর্তেই তিনি উপলব্ধি করেন, হয়তো এটাই ছিল প্রকৃত সংকেত—এবার সামনে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।

উসমান খাজার ক্যারিয়ার কখনোই সহজ ছিল না। অস্ট্রেলিয়ার মতো প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট সংস্কৃতিতে নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করা সহজ কাজ নয়। শুরুর দিকে দলে আসা-যাওয়ার মধ্যে দিয়েই কেটেছে তার ক্যারিয়ারের বড় একটি সময়। ইনজুরি, ফর্মহীনতা আর নির্বাচকদের আস্থার অভাব—সবকিছু মিলিয়ে বহুবার মনে হয়েছিল, হয়তো এখানেই শেষ। কিন্তু প্রতিবারই নিজেকে নতুন করে প্রমাণ করেছেন খাজা। বিশেষ করে পরিণত বয়সে এসে তিনি হয়ে ওঠেন অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ব্যাটার।

টেস্ট ক্রিকেটে খাজার অবদান সংখ্যার বাইরেও অনেক বেশি। ৮৭টি টেস্ট ম্যাচে তার সংগ্রহ ৬ হাজার ২০৬ রান, রয়েছে ১৬টি শতক। কঠিন পরিস্থিতিতে দলের হাল ধরা, নতুন বল সামলানো এবং লম্বা ইনিংস খেলার ক্ষেত্রে তার দক্ষতা অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট ব্যাটিং লাইনআপকে বহুবার স্থিতি দিয়েছে। বিশেষ করে উপমহাদেশে ও উপমহাদেশীয় বংশোদ্ভূত ক্রিকেটার হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার জার্সিতে তার সাফল্য অনেক তরুণের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে।

খাজা শুধু একজন ক্রিকেটার নন, তিনি অস্ট্রেলিয়ার বহুসাংস্কৃতিক সমাজেরও এক প্রতীক। পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত মুসলিম পরিবার থেকে উঠে এসে অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট ক্যাপ পরা ছিল এক ঐতিহাসিক ঘটনা। তার ক্যারিয়ারে ধর্ম, পরিচয় কিংবা সংস্কৃতি কখনোই ক্রিকেটের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি, বরং তিনি তা শক্তিতে রূপান্তর করেছেন। মাঠের বাইরেও সামাজিক ইস্যুতে তার সচেতন অবস্থান তাকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।

অ্যাশেজের মতো মর্যাদাপূর্ণ সিরিজে, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে, নিজের শেষ টেস্ট খেলার সুযোগ পাওয়াটাকে খাজা ভাগ্যের বিশেষ দান বলেই মনে করছেন। ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছেও এই ম্যাচ আলাদা গুরুত্ব বহন করবে। সিডনি টেস্ট তাই শুধু একটি সিরিজের শেষ ম্যাচ নয়, এটি এক যোদ্ধা ক্রিকেটারের বিদায়ী মঞ্চ। দর্শকদের চোখে থাকবে আবেগ, সতীর্থদের মধ্যে থাকবে সম্মান আর প্রতিপক্ষের কাছেও থাকবে শ্রদ্ধা।

ক্রিকেটবিশ্ব মনে করছে, খাজার বিদায় অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট দলের জন্য একটি যুগের অবসান। তরুণদের জন্য জায়গা তৈরি হলেও অভিজ্ঞতা ও স্থিরতার যে ঘাটতি তৈরি হবে, তা পূরণ করা সহজ হবে না। তবে খাজা নিজে বিশ্বাস করেন, দল ভালো হাতেই আছে। নতুন প্রজন্ম দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত, আর সেটাই ছিল তার বিদায়ের সঠিক সময় বেছে নেওয়ার অন্যতম কারণ।

সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে শেষবার ব্যাট হাতে নামার সময় খাজার চোখে থাকবে স্মৃতির ঝলক—অভিষেকের দিন, প্রথম শতক, ব্যর্থতার দিনগুলো, আবার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। সবকিছু মিলিয়ে একটি পূর্ণ বৃত্তের সমাপ্তি। ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য এটি হবে বিদায়ের মুহূর্ত, আর উসমান খাজার জন্য হবে গর্বের সঙ্গে বলা এক বাক্য—আমি আমার মতো করেই শেষ করেছি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত