খেরসনে ড্রোন হামলায় নিহত ২৪, নববর্ষের আনন্দে নেমে এলো শোক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৯ বার
খেরসনে ড্রোন হামলায় নিহত ২৪, নববর্ষের আনন্দে নেমে এলো শোক

প্রকাশ: ০২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নববর্ষের উৎসবের আনন্দ মুহূর্তেই রক্তাক্ত শোকে রূপ নিল ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় শহর খেরসনে। রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত এই অঞ্চলে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় অন্তত ২৪ জন নিহত এবং আরও অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে মস্কো। বৃহস্পতিবার রাতে নববর্ষ উদযাপনের সময় একটি হোটেল ও ক্যাফেকে লক্ষ্য করে একাধিক ড্রোন হামলা চালানো হয়। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তারা এই ঘটনাকে ‘পরিকল্পিত হামলা’ ও ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। খবর বার্তা সংস্থা আনাদোলুর।

খেরসন অঞ্চলে রাশিয়া-নিয়োগপ্রাপ্ত গভর্নর ভ্লাদিমির সালদো প্রথমে টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, নববর্ষ উদযাপনের সময় বেসামরিক নাগরিকদের উপস্থিতি থাকা একটি স্থানে ইচ্ছাকৃতভাবে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, একটি ক্যাফে ও একটি হোটেলে তিনটি ড্রোন আঘাত হানে। প্রাথমিক তথ্যে জানা যায়, এই হামলায় অন্তত ২৪ জন নিহত হন এবং ৫০ জনের বেশি মানুষ আহত হন, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর।

সালদো দাবি করেন, হামলাটি ছিল সুপরিকল্পিত এবং এতে বেসামরিক নাগরিকদেরই লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তিনি এটিকে স্পষ্ট যুদ্ধাপরাধ বলে উল্লেখ করেন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আহ্বান জানান। গভর্নরের ঘোষণায় জানানো হয়, নিহতদের স্মরণে এবং শোক প্রকাশের অংশ হিসেবে আগামী ২ ও ৩ জানুয়ারি খেরসন অঞ্চলে শোক দিবস পালন করা হবে।

রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা টেলিগ্রামে দেওয়া এক পৃথক বিবৃতিতে বলেন, এই হামলার দায় শুধু ইউক্রেনের নয়, বরং ইউক্রেনকে সমর্থন দেওয়া পশ্চিমা দেশগুলোর ওপরও বর্তায়। তার অভিযোগ, পশ্চিমা সমর্থন ও গোয়েন্দা সহায়তা ছাড়া এমন হামলা চালানো সম্ভব নয়। তিনি বলেন, বেসামরিক মানুষের ওপর এই ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও যুদ্ধ আইনের চরম লঙ্ঘন।

খেরসনের পরিস্থিতি নিয়ে রাশিয়ার পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, এই হামলায় ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত থাকতে পারে। যদিও এই দাবির পক্ষে কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি। এ বিষয়ে ব্রিটেন বা ইউক্রেনের পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার অভিযোগ করে আসছে।

খেরসন অঞ্চলটি ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এলাকা। ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনের চারটি অঞ্চল—খেরসন, দোনেৎস্ক, লুহানস্ক ও জাপোরিঝঝিয়াকে নিজেদের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করে। এই ঘোষণা কিয়েভ ও অধিকাংশ পশ্চিমা দেশ অবৈধ দখল হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এসব অঞ্চল এখনও ইউক্রেনের অংশ বলেই বিবেচিত হয়। ফলে খেরসন নিয়ে সংঘাত ও পাল্টাপাল্টি হামলা যুদ্ধের শুরু থেকেই চলমান।

স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, হামলার সময় হোটেল ও ক্যাফেগুলোতে নববর্ষ উদযাপন করছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা ও অতিথিরা। আকস্মিক বিস্ফোরণে চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েন। জরুরি উদ্ধারকারী দল ও চিকিৎসাকর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালগুলোতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয় এবং অতিরিক্ত চিকিৎসক ও নার্স ডাকা হয়।

এই হামলার মানবিক দিকটি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেক পর্যবেক্ষক। নববর্ষের মতো উৎসবের সময়ে বেসামরিক স্থাপনায় হামলা সাধারণ মানুষের মানসিক ক্ষত আরও গভীর করে তুলেছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে—এ কথা নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে এই ঘটনা।

রাশিয়া ও ইউক্রেন—উভয় পক্ষই বারবার দাবি করে আসছে যে তারা বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালায় না। তবে বাস্তবে যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবর্ষণের ফলে বেসামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। খেরসনের এই হামলাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ড্রোন প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারে যুদ্ধের ধরন বদলে গেছে। তুলনামূলক কম খরচে দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা থাকায় ড্রোন এখন যুদ্ধের অন্যতম প্রধান অস্ত্র। কিন্তু একই সঙ্গে এটি বেসামরিক মানুষের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ড্রোন হামলা হলে প্রাণহানি এড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে।

খেরসনে ঘোষিত শোক দিবসের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। সরকারি ভবন ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অর্ধনমিত পতাকা উত্তোলনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নিহতদের স্মরণে বিশেষ প্রার্থনা ও স্মরণসভা আয়োজনের কথাও জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। একই সঙ্গে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে, যাতে নতুন করে কোনো হামলার ঘটনা না ঘটে।

এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার না হলে এমন হামলা ও পাল্টা হামলা অব্যাহত থাকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বরাবরের মতোই বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

সব মিলিয়ে, খেরসনে নববর্ষের রাতে সংঘটিত এই ড্রোন হামলা ইউক্রেন যুদ্ধের ভয়াবহ বাস্তবতাকে আবারও সামনে এনে দিয়েছে। আনন্দের উৎসব মুহূর্তেই রক্তাক্ত ট্র্যাজেডিতে পরিণত হওয়ায় শোক ও ক্ষোভে স্তব্ধ হয়ে গেছে অঞ্চলটি। যুদ্ধ কবে থামবে, আর কবে সাধারণ মানুষ নিরাপদে নিঃশ্বাস নিতে পারবে—এই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত