প্রকাশ: ০২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরানে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে টানা পঞ্চম দিনের মতো হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে আসায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সরকারি সূত্র ও আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছেন এবং আরও বহু মানুষ আহত হয়েছেন। একই সঙ্গে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ও সরকারি সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগে অন্তত ৩০ জন বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাসহ আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলো এ তথ্য জানিয়েছে।
ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরান থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত লোরেস্তান প্রদেশের আজনা শহরে বিক্ষোভ চলাকালে অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। একই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ১৭ জন। স্থানীয় হাসপাতাল সূত্রের বরাতে জানা গেছে, আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক, ফলে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আজনা শহরের পাশাপাশি দেশটির অন্যান্য এলাকাতেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ফার্স জানায়, রাজধানী তেহরান থেকে প্রায় ৪৭০ কিলোমিটার দক্ষিণে চাহারমহল ও বাখতিয়ারি প্রদেশের লর্ডেগান শহরে বিক্ষোভের সময় আরও দুজন নিহত হন। এসব এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে এবং কোথাও কোথাও গুলি ছোড়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, বিভিন্ন শহরের রাস্তায় আগুন জ্বলছে, গাড়ির টায়ার পোড়ানো হচ্ছে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটছে। একাধিক ভিডিওতে গুলির শব্দ শোনা গেছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। যদিও এসব ভিডিওর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এসব দৃশ্যকে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে।
বিক্ষোভের তীব্রতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কোথাও কোথাও সরকারি ও আধা-সরকারি স্থাপনাও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। ফার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, কিছু বিক্ষোভকারী প্রাদেশিক গভর্নরের কার্যালয়, মসজিদ, শহীদ ফাউন্ডেশন, টাউন হল এবং ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক ভবনে পাথর নিক্ষেপ করে। এসব ঘটনায় সরকারি সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি সামাল দিতে নিরাপত্তা বাহিনী টিয়ার শেল ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালায়।
এর আগে বৃহস্পতিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, পশ্চিমাঞ্চলীয় কুহদাশত শহরে বিক্ষোভ চলাকালে নিরাপত্তা বাহিনীর একজন সদস্য নিহত হয়েছেন। এই ঘটনায় সরকারপন্থী মহল বিক্ষোভকারীদের সহিংসতার জন্য দায়ী করছে। অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠন ও সরকারবিরোধী গোষ্ঠীগুলো বলছে, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ফলেই প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।
এই বিক্ষোভের মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে জীবনযাত্রার ব্যয়ের লাগামছাড়া বৃদ্ধি। গত কয়েক মাস ধরে ইরানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দ্রুত বেড়েছে। খাদ্য, জ্বালানি, বাসাভাড়া ও ওষুধের মতো মৌলিক প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা—সব মিলিয়ে ইরানের সাধারণ মানুষের ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৯ ডিসেম্বর রোববার থেকে প্রথমে বিচ্ছিন্নভাবে বিক্ষোভ শুরু হয়। এরপর কয়েক দিনের মধ্যেই তা বিভিন্ন প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে। শুরুতে বিক্ষোভকারীরা শান্তিপূর্ণভাবে তাদের দাবি তুলে ধরলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কোথাও কোথাও স্লোগানের ভাষাও আরও কঠোর হয়ে উঠেছে, যা সরকারকে বাড়তি উদ্বেগে ফেলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইরানের সরকার বরাবরই দাবি করে আসছে যে, এসব বিক্ষোভের পেছনে বিদেশি শক্তির উসকানি রয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে বারবার বলা হচ্ছে, ‘শত্রু রাষ্ট্রগুলো’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে এবং অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে। তবে বিক্ষোভকারীদের বড় একটি অংশ বলছে, তাদের ক্ষোভের মূল কারণ অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট এবং জীবনের ন্যূনতম চাহিদা পূরণে সরকারের ব্যর্থতা।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইরানের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা বিক্ষোভ দমনের নামে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে এবং নিহত ও আহতদের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে। একই সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া বিক্ষোভকারীদের ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করার আহ্বানও জানানো হয়েছে।
ইরানের ইতিহাসে অর্থনৈতিক ইস্যুতে বিক্ষোভ নতুন নয়। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্বের প্রতিবাদে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব বিক্ষোভ দমন করতে গিয়ে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতি দেশটির জন্য নতুন এক রাজনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বিক্ষোভ কেবল তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের জমে থাকা অসন্তোষের প্রতিফলন। যদি সরকার দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেয় এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ না করে, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
সব মিলিয়ে, জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রতিবাদে শুরু হওয়া ইরানের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে এনেছে। রাজপথে মানুষের ক্ষোভ, নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ, প্রাণহানি ও গ্রেপ্তার—সবকিছু মিলিয়ে ইরান এখন এক উত্তাল সময় পার করছে। এই সংকট কোন পথে গড়াবে, তা নির্ভর করছে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ ও জনগণের সঙ্গে সংলাপের ওপর।