গংগারহাট সীমান্তে নিজ রাইফেলের গুলিতে বিজিবি সদস্যের মৃত্যু

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৭৯ বার
নিজ রাইফেলের গুলিতে কুড়িগ্রামে বিজিবি সদস্যের মৃত্যু

প্রকাশ: ০২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার গংগারহাট সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) এক তরুণ সদস্যের রহস্যজনক মৃত্যু সীমান্ত এলাকায় শোক ও উদ্বেগের আবহ তৈরি করেছে। বৃহস্পতিবার দিবাগত গভীর রাতে সীমান্ত ফাঁড়ির ভেতর নিজ সার্ভিস রাইফেলের গুলিতে তার মৃত্যু হয় বলে প্রাথমিকভাবে জানানো হয়েছে। তবে ঘটনাটিকে বিজিবির পক্ষ থেকে ‘আত্মহত্যা’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, সঠিক কারণ ও প্রেক্ষাপট নিয়ে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা তৈরি হয়েছে স্থানীয় মানুষ থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যেও।

নিহত বিজিবি সদস্যের নাম নাসিম উদ্দিন। বয়স মাত্র ২৪ বছর। তিনি ঝিনাইদহ জেলা সদরের খাজুরা গ্রামের আবুল মন্ডলের ছেলে। লালমনিরহাটস্থ বিজিবি ১৫ ব্যাটালিয়নের অধীনে ফুলবাড়ী উপজেলার গংগারহাট সীমান্ত ফাঁড়িতে তিনি সিপাহী পদে কর্মরত ছিলেন। সীমান্ত নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এমন মর্মান্তিক পরিণতি গোটা বাহিনীর জন্যই এক গভীর বেদনার সংবাদ।

পুলিশ ও বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে নাসিম উদ্দিন নিয়মিত দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে সীমান্ত টহলে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তিনি বাহিনীর পোশাক পরিহিত অবস্থায় নিজের সার্ভিস রাইফেল সঙ্গে নিয়ে ফাঁড়ির ভেতরে অবস্থান করছিলেন। রাত আনুমানিক পৌনে ১টার দিকে সীমান্ত ফাঁড়ির ভেতরের সৈনিক ব্যারাক এলাকা থেকে একটি গুলির শব্দ শোনা যায়। হঠাৎ এই শব্দে ফাঁড়িতে থাকা অন্য বিজিবি সদস্যরা ছুটে এসে দেখেন, নাসিম উদ্দিন রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে আছেন।

তাৎক্ষণিকভাবে তাকে উদ্ধার করে ফুলবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। তবে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, গুলিটি তার বুকের মাঝ বরাবর বিদ্ধ হয়েছিল, যা প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করা সহকর্মীদের জন্য ছিল অত্যন্ত হৃদয়বিদারক।

খবর পেয়ে রাত সাড়ে তিনটার দিকে ফুলবাড়ী থানা পুলিশ হাসপাতালে পৌঁছে মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে। পুলিশের পক্ষ থেকেও নিশ্চিত করা হয়েছে, নিহত সিপাহির বুকের মাঝখানে গুলির স্পষ্ট চিহ্ন রয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে এটি নিজ রাইফেলের গুলি বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

ফুলবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদ হাসান জানান, বিজিবির পক্ষ থেকে বিষয়টি আত্মহত্যা বলে প্রাথমিকভাবে জানানো হয়েছে। সে অনুযায়ী একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে তিনি জানান।

তবে নাসিম উদ্দিন কেন এমন চরম সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, সে বিষয়ে এখনো কোনো সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। পরিবার, সহকর্মী কিংবা কর্তৃপক্ষ—কেউই নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না। সহকর্মীদের ভাষ্যমতে, নাসিম উদ্দিন স্বাভাবিকভাবেই দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং ঘটনার আগে তার আচরণে অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়েনি বলে অনেকে দাবি করেছেন। ফলে এটি নিছক আত্মহত্যা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো মানসিক চাপ, পারিবারিক কারণ বা কর্মস্থলজনিত বিষয় ছিল—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

বাংলাদেশের বড় দুশ্চিন্তা ব্যাটিং

নিহতের পরিবার এই সংবাদে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। পরিবারের সদস্যরা জানান, নাসিম উদ্দিন নিয়মিত ফোনে কথা বলতেন এবং কখনোই নিজের মধ্যে কোনো হতাশার কথা প্রকাশ করেননি। পরিবারের আশা, তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটিত হবে এবং কোনো অস্পষ্টতা থাকলে তা দূর হবে।

সীমান্তে কর্মরত বিজিবি সদস্যদের জীবন যে কতটা কঠিন ও মানসিক চাপপূর্ণ, এই ঘটনাটি সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। সীমান্ত নিরাপত্তা, চোরাচালান দমন, অনুপ্রবেশ রোধসহ নানা ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সময় দীর্ঘদিন পরিবার থেকে দূরে থাকতে হয় তাদের। শীত, বৃষ্টি, কুয়াশা কিংবা দুর্গম পরিবেশ—সবকিছুর মধ্যেই দায়িত্ব পালন করতে হয় এই বাহিনীর সদস্যদের। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ধরনের ঘটনার পেছনে মানসিক চাপ, একাকিত্ব কিংবা কর্মস্থলের টানাপোড়েন ভূমিকা রাখতে পারে, যা গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

এদিকে ঘটনার পরপরই বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করেছে বলে জানা গেছে। যদিও বিজিবি ৩৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়কের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত তার কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে বাহিনীর পক্ষ থেকে এই মৃত্যুর বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা এখনো আসেনি।

স্থানীয়দের মধ্যেও এই মৃত্যু নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যের এমন মৃত্যু সাধারণ মানুষের মনেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। অনেকেই বলছেন, তদন্ত যেন নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয়, যাতে কোনো প্রশ্ন অমীমাংসিত না থাকে।

সব মিলিয়ে, গংগারহাট সীমান্তে তরুণ বিজিবি সদস্য নাসিম উদ্দিনের মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং এটি সীমান্ত রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীর মানসিক স্বাস্থ্য, কর্মপরিবেশ ও সার্বিক কল্যাণ নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও তদন্তের ফলাফলই এখন বলে দেবে, এই মৃত্যুর পেছনে প্রকৃত সত্য কী। ততদিন পর্যন্ত পরিবার, সহকর্মী এবং দেশবাসী এক তরুণ সীমান্তপ্রহরীর অকালপ্রয়াণে শোকাহত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত