দক্ষিণ ইয়েমেন স্বাধীনতার পথে? এসটিসির ঘোষণায় নতুন উত্তেজনা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৩ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৬ বার
দক্ষিণ ইয়েমেন স্বাধীনতার পথে? এসটিসির ঘোষণায় নতুন উত্তেজনা

প্রকাশ: ০৩ জানুয়ারি ২০২৬। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘদিনের যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মানবিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে চলা ইয়েমেনে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলকে উত্তর থেকে পৃথক করার ঘোষণা। বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র রাজনৈতিক গোষ্ঠী সাউদার্ন ট্রানজিশন কাউন্সিল বা এসটিসি জানিয়েছে, আগামী দুই বছরের মধ্যে দক্ষিণ ইয়েমেনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি গণভোট আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। শুক্রবার টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে এসটিসির সভাপতি আইদারোস আলজুবিদি এই ঘোষণা দেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এই তথ্য জানিয়েছে।

আইদারোস আলজুবিদি তার ভাষণে বলেন, দক্ষিণ ইয়েমেনের জনগণের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার রয়েছে এবং সেই অধিকার বাস্তবায়নে এসটিসি একটি অন্তর্বর্তীকালীন পর্ব শুরু করছে। তার ভাষায়, এই দুই বছরের সময়কালকে একটি সংলাপ ও প্রস্তুতির পর্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দক্ষিণ ও উত্তর ইয়েমেনের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে গঠনমূলক সংলাপে পৃষ্ঠপোষকতা করার আহ্বান জানান, যাতে একটি রাজনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি হয়।

তবে একই সঙ্গে তিনি কড়া সতর্কবার্তাও উচ্চারণ করেন। আলজুবিদি বলেন, যদি কোনো সংলাপ শুরু না হয় কিংবা দক্ষিণ ইয়েমেন পুনরায় সামরিক আগ্রাসনের মুখে পড়ে, তাহলে এসটিসি অবিলম্বে দক্ষিণের স্বাধীনতা ঘোষণা করতে বাধ্য হবে। তার এই বক্তব্য ইয়েমেনের চলমান সংঘাতকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে এসটিসির শক্ত অবস্থান নতুন নয়। দেশটির ইতিহাসে দক্ষিণ ইয়েমেন একসময় একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল। ১৯৯০ সালে উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেন একীভূত হলেও রাজনৈতিক বৈষম্য, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও অর্থনৈতিক অবহেলার অভিযোগ বরাবরই দক্ষিণাঞ্চলের জনগণের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই অসন্তোষ সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে, যার নেতৃত্বে রয়েছে এসটিসি।

এই ঘোষণার প্রেক্ষাপটে সামরিক পরিস্থিতিও দ্রুত অবনতি হচ্ছে। গত মাসে সৌদি আরব সমর্থিত বাহিনী সংযুক্ত আরব আমিরাত সমর্থিত এসটিসির দখলে থাকা এলাকাগুলো পুনরুদ্ধারের জন্য অভিযান শুরু করে। এর ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের দুই প্রভাবশালী শক্তি সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে পরোক্ষ দ্বন্দ্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যদিও দুই দেশই আনুষ্ঠানিকভাবে ইয়েমেনে একই জোটের অংশ, বাস্তবে তাদের সমর্থিত পক্ষগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছে।

শুক্রবার ইয়েমেনের সৌদি সীমান্তবর্তী হাদরামাউত প্রদেশে নতুন করে সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়। সেখানে হাদরামাউতের সৌদি সমর্থিত গভর্নরের অনুগত বাহিনী এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী এসটিসির যোদ্ধাদের মধ্যে তীব্র লড়াই শুরু হয়। এই সংঘর্ষে উভয় পক্ষই হতাহতের শিকার হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে ইয়েমেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে সৌদি আরবের বিমান হামলায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ওয়াদি হাদরামাউত ও হাদরামাউত মরুভূমি অঞ্চলে এসটিসির প্রধান মোহাম্মদ আব্দুল মালিক জানান, আল-খাসার একটি শিবিরে পরিচালিত সাতটি বিমান হামলায় অন্তত সাতজন নিহত এবং ২০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন। এসব হামলা এসটিসির যোদ্ধা ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

এসটিসির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এই ধরনের হামলা দক্ষিণ ইয়েমেনের জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ও বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি আরও গভীর করছে। সংগঠনটির নেতারা দাবি করছেন, দক্ষিণাঞ্চল বারবার সামরিক আগ্রাসনের শিকার হওয়ায় জনগণ স্বাধীনতার দাবিতে আরও ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। তবে সৌদি সমর্থিত পক্ষগুলো বলছে, এসব অভিযান ইয়েমেনের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর দখলদারি ঠেকানোর অংশ।

ইয়েমেন সংকটের মূল প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে ২০১৪ সালের ঘটনাপ্রবাহে ফিরে যেতে হয়। ওই বছর ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে নেয়। এর পর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আব্দ রাব্বু মনসুর আল হাদি দেশ ছেড়ে সৌদি আরবে আশ্রয় নেন। হুথিদের দমন এবং আল হাদিকে পুনরায় ক্ষমতায় ফেরাতে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইয়েমেনের সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে একটি সামরিক জোট গঠন করা হয়।

২০১৫ সাল থেকে এই জোট হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। তবে প্রায় এক দশক ধরে চলা এই সংঘাতে হুথি গোষ্ঠীকে পুরোপুরি দুর্বল করা সম্ভব হয়নি। বরং ইয়েমেন একটি গভীর মানবিক সংকটে নিমজ্জিত হয়েছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ইয়েমেনকে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

বর্তমানে ইয়েমেন কার্যত বিভক্ত। রাজধানী সানা ও উত্তরাঞ্চলের বড় একটি অংশ হুথি গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা ইয়েমেন প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিলের অধীনে থাকলেও সেখানে এসটিসির প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী। সৌদি আরব ও তার নেতৃত্বাধীন জোট প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিলকে ইয়েমেনের বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে সেই সরকারের কর্তৃত্ব সীমিত।

এই প্রেক্ষাপটে এসটিসির স্বাধীনতার ঘোষণা ইয়েমেন সংকটকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ ইয়েমেনের স্বাধীনতার প্রশ্নটি শুধু অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং এটি আঞ্চলিক রাজনীতি, উপসাগরীয় শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এসটিসির ঘোষণার বিষয়ে কোনো সমর্থন বা বিরোধিতা প্রকাশ করেনি। তবে জাতিসংঘ ও বিভিন্ন পশ্চিমা দেশ বরাবরের মতো ইয়েমেনে একটি রাজনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়ে আসছে। তারা মনে করছে, নতুন করে বিভাজনের উদ্যোগ দেশটিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

অন্যদিকে দক্ষিণ ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ইতোমধ্যেই যুদ্ধ ও দারিদ্র্যের ভারে নুয়ে পড়েছে। বহু মানুষ খাদ্য, চিকিৎসা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে স্বাধীনতার ঘোষণা তাদের মধ্যে আশা যেমন জাগাচ্ছে, তেমনি নতুন সংঘাতের আশঙ্কাও তৈরি করছে।

সব মিলিয়ে, এসটিসির এই ঘোষণা ইয়েমেন সংকটে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। আগামী দুই বছরে সংলাপ, সংঘর্ষ নাকি বিভাজন—কোন পথে এগোবে দেশটি, তা নির্ভর করবে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অবস্থান, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং ইয়েমেনের জনগণের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার ওপর। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরবে নাকি সংকট আরও গভীর হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত