প্রকাশ: ০৩ জানুয়ারি ২০২৬। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নতুন বছরের প্রথম দিনটা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও তার দল আল নাসরের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকার কথা ছিল আনন্দ আর আত্মবিশ্বাসে ভর করে। টানা জয়, শীর্ষ ফর্ম, ভক্তদের প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে সৌদি প্রো লিগে ২০২৬ সাল শুরু করার আগে আল নাসর ছিল এক অনন্য অবস্থানে। কিন্তু ফুটবল যেমন অনিশ্চয়তার খেলা, তেমনি বাস্তবতাও নির্মম। বছরের শুরুতেই সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হলো আল নাসর। শক্তিশালী আল আহলির বিপক্ষে নাটকীয় এক ম্যাচে ৩–২ গোলে পরাজয়ের মাধ্যমে থেমে গেল টানা ১০ জয়ের দারুণ ধারা। হতাশ মুখে মাঠ ছাড়তে দেখা গেল পর্তুগিজ মহাতারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকেও।
সৌদি প্রো লিগের এই বহুল আলোচিত ম্যাচটি শুরু থেকেই ছিল উত্তেজনায় ভরপুর। স্বাগতিক আল আহলি শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে এবং খুব দ্রুতই তার ফল পায়। ম্যাচের সপ্তম মিনিটেই আল নাসরের রক্ষণভাগে ধাক্কা দেয় ইংলিশ ফরোয়ার্ড টোনি ইভান। বক্সের ভেতরে সুযোগ পেয়ে নিখুঁত শটে তিনি গোল করে দলকে এগিয়ে দেন। গোলটি শুধু স্কোরলাইনই নয়, ম্যাচের গতিপথও অনেকটা বদলে দেয়।
গোল হজমের পর আল নাসর কিছুটা চাপে পড়ে যায়। মাঝমাঠে বল দখলে রাখার চেষ্টা করলেও আক্রমণে সেই ধারালো ভাবটা দেখা যাচ্ছিল না। এরই মধ্যে ২০তম মিনিটে আবারও আঘাত হানে আল আহলি। নিজেদের অর্ধ থেকে আসা একটি লম্বা পাসে দুর্দান্ত গতি নিয়ে ছুটে যান টোনি ইভান। আল নাসরের গোলরক্ষক নাওয়াফ আল আকিদিকে একা পেয়ে ঠান্ডা মাথায় তাকে পরাস্ত করেন এই ইংলিশ ফরোয়ার্ড। মাত্র ২০ মিনিটেই ২–০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে আল নাসর, আর গ্যালারিতে থাকা সমর্থকদের মধ্যে নেমে আসে স্তব্ধতা।
তবে এত সহজে হার মানতে রাজি ছিল না আল নাসর। দলের অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার মার্সেলো ব্রোজোভিচ ও রক্ষণভাগের খেলোয়াড়রা ধীরে ধীরে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করেন। ৩০তম মিনিটে সেই চেষ্টার ফল মেলে। আল নাসরের সেন্টারব্যাক আব্দুল্লাহ আল-আমরি দূরপাল্লা থেকে একটি শট নেন, যা আল আহলি গোলরক্ষক আবদুলরহমান আল সানবির পা ছুঁয়ে জালে ঢুকে যায়। এই গোল ম্যাচে নতুন প্রাণ সঞ্চার করে এবং আল নাসরের খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস কিছুটা বাড়ায়।
প্রথমার্ধের শেষের দিকে আল নাসর আরও চড়াও হয়। বিরতির ঠিক আগে মার্সেলো ব্রোজোভিচের নেওয়া কর্নার থেকে দুর্দান্ত এক হেডে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন আব্দুল্লাহ আল-আমরি। স্কোরলাইন তখন ২–২। প্রথমার্ধের শেষে সমতায় ফিরে এসে আল নাসর যেন আবারও প্রমাণ করল, তারা সহজে হার মানার দল নয়। এই দুই গোলের মধ্য দিয়ে ম্যাচটি নতুন করে উত্তেজনার মোড় নেয়।
দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হলে আল আহলি আবারও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে। মাঝমাঠে তাদের চাপ এবং দ্রুত পাসিং আল নাসরের জন্য সমস্যা তৈরি করতে থাকে। ৫৩তম মিনিটে আসে ম্যাচের নির্ধারক মুহূর্ত। আল আহলির ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার মাতেউস গনসালভেসের নেওয়া ফ্রি-কিক প্রথমে টোনি ইভানের পায়ে লাগে এবং সেখান থেকে বলটি মেরিহ দেমিরালের সামনে পড়ে। তুর্কি ডিফেন্ডার সুযোগ হাতছাড়া করেননি; শক্ত শটে জাল খুঁজে নেন তিনি। ৩–২ ব্যবধানে আবারও এগিয়ে যায় আল আহলি।
এই গোলের পর ম্যাচের চিত্র বদলে যায়। পিছিয়ে পড়ে আল নাসর আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঠিকই, কিন্তু সেই আক্রমণে ধার আর সমন্বয়ের ঘাটতি স্পষ্ট ছিল। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এদিন ছিলেন তুলনামূলক নিষ্প্রভ। কয়েকটি সুযোগ তৈরি করার চেষ্টা করলেও আল আহলির রক্ষণভাগ তাকে কার্যকরভাবে আটকে রাখে। বল দখলে এগিয়ে থাকলেও আল নাসর তেমন পরিষ্কার গোলের সুযোগ তৈরি করতে পারেনি।
ম্যাচের শেষ দিকে কোচের দিকনির্দেশনায় আল নাসর আরও আক্রমণাত্মক হয়, কিন্তু আল আহলির সংগঠিত রক্ষণ ও সময়োপযোগী চাপ তাদের পরিকল্পনা ভেস্তে দেয়। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে আল আহলি শিবিরে উল্লাস আর আল নাসর শিবিরে নেমে আসে হতাশা।
এই পরাজয়ের মাধ্যমে সৌদি প্রো লিগের চলতি মৌসুমে ১১ ম্যাচ পর হারের স্বাদ পেল আল নাসর। এর আগে টানা ১০টি ম্যাচ জয়ের পাশাপাশি একটি ড্র নিয়ে তারা ছিল দারুণ ছন্দে। আল আহলির বিপক্ষে হারের আগে আল নাসরের সংগ্রহ ছিল ৩১ পয়েন্ট, যা তাদের শিরোপার দৌড়ে শক্ত অবস্থানে রেখেছিল। তবে এই হার শিরোপা লড়াইয়ে নতুন করে চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে, আল আহলির জন্য এই জয় ছিল আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর মতো এক অর্জন। শক্তিশালী আল নাসরের বিপক্ষে এমন জয় তাদের লিগে অবস্থান মজবুত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের ম্যাচগুলোর জন্য মনোবল বাড়াবে।
সব মিলিয়ে, নতুন বছরের শুরুতে সৌদি প্রো লিগে এই ম্যাচটি প্রমাণ করে দিল—ফুটবলে কোনো ধারাই চিরস্থায়ী নয়। একদিনের হতাশা যেমন আল নাসরের জন্য শিক্ষা হয়ে থাকবে, তেমনি আল আহলির জন্য এটি হয়ে থাকবে প্রেরণার উৎস। আর ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর জন্য নতুন বছর শুরু হলো চ্যালেঞ্জ আর প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখে ফেলার নতুন সুযোগ নিয়ে।