প্রকাশ: ০৪ জানুয়ারি ২০২৬। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চালের দাম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ কাজ করে। নিত্যপ্রয়োজনীয় এই খাদ্যপণ্যের সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করে। তবে নতুন বছরের শুরুতেই চালের বাজার নিয়ে আশাবাদী বার্তা দিয়েছেন খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার। তিনি বলেছেন, চলতি বছরে চালের দাম বাড়ার কোনো কারণ দেখছেন না। সরকারের খাদ্যশস্য মজুদ অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি থাকায় বাজার স্থিতিশীল থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
রোববার সচিবালয়ে খাদ্যশস্য মজুদের সার্বিক অবস্থা নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন খাদ্য উপদেষ্টা। সেখানে তিনি জানান, বর্তমানে দেশের সরকারি গুদামগুলোতে ২০ লাখ ২৭ হাজার ৪২০ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য মজুদ রয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রয়োজনে আরও ২৪ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য মজুদ করার সক্ষমতাও সরকারের হাতে আছে। তার ভাষায়, এই মজুদ দেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য একটি বড় শক্ত ভিত তৈরি করেছে।
খাদ্য উপদেষ্টা বলেন, গত বছর সরকার গঠনের সময় রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং একাধিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবে চালের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। বন্যা, অতিবৃষ্টি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্নের কারণে উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থাপনায় চাপ পড়ে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে চালের দামে। তবে চলতি বছরে সেই পরিস্থিতি নেই। বরং উৎপাদন, আমদানি ও মজুদ—এই তিনটি ক্ষেত্রেই সরকার তুলনামূলকভাবে স্বস্তিকর অবস্থানে রয়েছে।
তিনি আরও জানান, গত পাঁচ বছরের তুলনায় এবার খাদ্যশস্যের মজুদ সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এই মজুদ শুধু পরিসংখ্যানগত সাফল্য নয়, বরং বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের সক্ষমতার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত। খাদ্য উপদেষ্টার মতে, যদি সরবরাহ ব্যবস্থা বা সাপ্লাই চেইন সঠিকভাবে পরিচালনা করা যায়, তাহলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকবে না। এতে ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতাও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
চালের বাজারে আমদানির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন আলী ইমাম মজুমদার। তিনি বলেন, ভারত থেকে চাল আমদানি বর্তমানে স্বাভাবিক রয়েছে এবং এ বিষয়ে কোনো রাজনৈতিক জটিলতা বা অনিশ্চয়তা তিনি দেখছেন না। প্রতিবেশী দেশ ভারত বাংলাদেশের চাল আমদানির একটি বড় উৎস। অতীতে দুই দেশের রাজনৈতিক টানাপোড়েন বা নীতিগত পরিবর্তনের কারণে আমদানিতে প্রভাব পড়েছে, যার ফলে দেশের বাজারে দামের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। তবে এবার সেই পরিস্থিতি নেই বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত মজুদ থাকলে বাজারে সরকারের হস্তক্ষেপ সহজ হয়। প্রয়োজনে ওএমএস বা খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির মাধ্যমে চাল ছাড়ার সুযোগ থাকে, যা সরাসরি দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের উপকারে আসে। খাদ্য উপদেষ্টার বক্তব্যে সেই দিকটিও গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি ইঙ্গিত দেন, সরকার চাইলে যে কোনো সময় বাজারে চাল সরবরাহ বাড়িয়ে মূল্য নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারবে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, চালের দাম স্থিতিশীল রাখতে শুধু মজুদ থাকলেই হবে না, বরং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াও জরুরি। উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে মৌসুমি ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে বাজার অনেকটাই স্থির থাকবে। খাদ্য উপদেষ্টার বক্তব্যে সেই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা গেছে।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে চালের দাম স্থিতিশীল থাকা মানে সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি। দেশের একটি বড় অংশের মানুষ এখনো আয়ের বড় অংশ খাদ্য খাতে ব্যয় করে। চালের দাম না বাড়লে তাদের সংসারের বাজেট কিছুটা হলেও ভারসাম্যপূর্ণ থাকে। শ্রমজীবী মানুষ, দিনমজুর, নিম্ন আয়ের কর্মচারী ও গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
কৃষকদের দিক থেকেও বিষয়টি সংবেদনশীল। খাদ্য উপদেষ্টা জানিয়েছেন, সরকার এমন নীতি অনুসরণ করছে যাতে একদিকে কৃষক ন্যায্যমূল্য পান, অন্যদিকে ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে। সরকারি ক্রয় কার্যক্রম, আমদানি নীতি ও মজুদ ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ের মাধ্যমেই এই ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, চলতি বছরে যদি বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না ঘটে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বড় কোনো অস্থিরতা না দেখা দেয়, তাহলে সরকারের এই আশাবাদ বাস্তবে রূপ নিতে পারে। তবে তারা সতর্ক করে বলেন, বৈশ্বিক বাজারে চালসহ খাদ্যপণ্যের দাম নানা কারণে হঠাৎ পরিবর্তিত হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতি বা জ্বালানি দামের ওঠানামা—সবকিছুই খাদ্যবাজারে প্রভাব ফেলে। সেক্ষেত্রে সরকারকে সবসময় প্রস্তুত থাকতে হবে।
খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদারের বক্তব্যে স্পষ্ট যে, সরকার এই মুহূর্তে খাদ্যশস্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে আত্মবিশ্বাসী। মজুদ, আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থার সমন্বয়ে চালের বাজার স্থিতিশীল রাখাই তাদের লক্ষ্য। বছরের শুরুতেই এমন আশাবাদী বার্তা সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা হলেও আস্থা তৈরি করেছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, চালের বাজার নিয়ে সরকারের এই আশ্বাস বাস্তবায়িত হলে তা শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এখন দেখার বিষয়, বছরের বাকি সময়জুড়ে সরকার কীভাবে এই মজুদ ও ব্যবস্থাপনাকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারে এবং সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে সক্ষম হয়।










