প্রকাশ: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
অ্যাশেজ মানেই চাপ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর চরিত্রের পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় সিডনি টেস্টে আবারও নিজের জাত চিনিয়েছেন জো রুট। যখন একের পর এক সতীর্থ ব্যর্থ, যখন পুরোনো হতাশার স্মৃতি ভর করতে চাচ্ছিল ইংল্যান্ডের ড্রেসিংরুমে, তখন একাই দেয়াল হয়ে দাঁড়ান এই অভিজ্ঞ ব্যাটার। ওয়ান ম্যান আর্মির প্রকৃত সংজ্ঞা যেন নতুন করে লিখে দিলেন রুট। তার অনবদ্য ১৬০ রানের ইনিংসে ভর করে অ্যাশেজের শেষ টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৩৮৪ রানে থেমেছে ইংল্যান্ড। আপাতত চা বিরতিতে দুই দল, প্রথম ইনিংসে ব্যাটিংয়ের অপেক্ষায় স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়া।
সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে এই ইনিংস শুধু একটি বড় ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং মানসিকভাবে বিধ্বস্ত একটি দলের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। সিরিজের প্রথম তিন টেস্টে বারবার টপ অর্ডারের ভাঙন, মাঝখানে ধস আর লেজের অসহায়ত্ব—সব মিলিয়ে ইংল্যান্ড শিবিরে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সেই প্রেক্ষাপটে রুটের ইনিংস যেন সতীর্থদের জন্য এক নীরব বার্তা—লড়াই এখনও শেষ হয়নি।
ইংল্যান্ড অধিনায়ক বেন স্টোকস টস জিতে আগে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেন। শুরুটা মন্দ ছিল না। জ্যাক ক্রলি ও বেন ডাকেট আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে ইনিংস গড়ার ইঙ্গিত দেন। বিশেষ করে ডাকেট বরাবরের মতোই আগ্রাসী ছিলেন। মিচেল স্টার্কের ওপর চড়াও হয়ে একের পর এক বাউন্ডারি হাঁকান তিনি। তবে অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞ পেসার শেষ পর্যন্ত নিজের জাত চিনিয়েছেন। ২৪ বলে ২৭ রান করা ডাকেটকে ফিরিয়ে দিয়ে সিরিজে পঞ্চমবারের মতো তাকে আউট করেন স্টার্ক।
এরপরই ইংল্যান্ডের ইনিংসে নামে অস্থিরতা। মাইকেল নেসেরের বলে এলবিডব্লু হয়ে ফেরেন ক্রলি, তার ব্যাট থেকে আসে ১৬ রান। তিনে নামা তরুণ বেথেল ছিলেন অতিমাত্রায় সতর্ক। প্রথম রান পেতেই তাকে খেলতে হয় ১৫ বল। কিন্তু থিতু হওয়ার আগেই স্কট বোল্যান্ডের নিখুঁত লাইনে বল তাকে ফিরিয়ে দেয়। উইকেটের পেছনে অ্যালেক্স ক্যারির হাতে ক্যাচ দিয়ে বেথেল আউট হন ১০ রানে। মাত্র ১৩ ওভারেই তিন উইকেট হারিয়ে ইংল্যান্ডের স্কোর তখন ৫৭। ঠিক তখনই ভেসে উঠছিল আগের টেস্টগুলোর দুঃস্বপ্ন।
এই সংকটময় মুহূর্তে ক্রিজে দাঁড়ান জো রুট ও হ্যারি ব্রুক। দুজনেই জানতেন, এখান থেকে ম্যাচের রাশ না ধরতে পারলে ইংল্যান্ড আবারও ব্যাকফুটে চলে যাবে। শুরুটা তাই ছিল দেখেশুনে। অস্ট্রেলিয়ান পেস আক্রমণের গতি, বাউন্স আর মুভমেন্ট সামলে ধীরে ধীরে ইনিংস গড়তে থাকেন তারা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আত্মবিশ্বাস বাড়ে, স্ট্রোকপ্লে খুলে যায়।
বৃষ্টিবিঘ্নিত প্রথম দিনে মাত্র ৪৫ ওভার খেলা হলেও রুট ও ব্রুক ইংল্যান্ডকে বড় স্বস্তি এনে দেন। দিন শেষে তিন উইকেটে ২১১ রান নিয়ে মাঠ ছাড়ে সফরকারীরা। ব্রুক তখন অপরাজিত ৭৮ রানে, রুট ব্যাট করছিলেন ৭২ রানে। সিডনির গ্যালারিতে বসে থাকা দর্শকরাও বুঝতে পারছিলেন, এই জুটি ভাঙা অস্ট্রেলিয়ার জন্য সহজ হবে না।
দ্বিতীয় দিনের শুরুতে অস্ট্রেলিয়া সেই প্রত্যাশা নিয়েই মাঠে নামে। শুরুটা সফলও হয় তাদের জন্য। হ্যারি ব্রুক ৮৪ রান করে আউট হন। তার ইনিংসটিও ছিল গুরুত্বপূর্ণ—চাপের মুখে তরুণ ব্যাটারের এই পারফরম্যান্স ইংল্যান্ডের ভবিষ্যতের জন্য আশাব্যঞ্জক। ব্রুক ফেরার পর অনেকেই ভেবেছিলেন, এবার বুঝি ইংল্যান্ডের ইনিংস দ্রুত গুটিয়ে যাবে। কিন্তু রুট ছিলেন অন্য মেজাজে।
একপ্রান্ত আগলে রেখে তিনি একের পর এক সঙ্গীর সঙ্গে ছোট-বড় জুটি গড়তে থাকেন। জেমি স্মিথের সঙ্গে তার জুটিটি ছিল কার্যকর ও সময়োপযোগী। স্মিথ করেন ৪৬ রান, রুটকে দারুণ সঙ্গ দেন। এরপর উইল জ্যাকস এসে ২৭ রানের ক্যামিও খেলেন। প্রতিটি জুটিতেই রুট ছিলেন নিয়ন্ত্রক শক্তি। কখন আক্রমণ করতে হবে, কখন রক্ষণাত্মক থাকতে হবে—সব সিদ্ধান্ত যেন নিখুঁতভাবে নিচ্ছিলেন তিনি।
রুটের ইনিংসটি ছিল ধৈর্য, অভিজ্ঞতা আর ক্লাসের মিশেল। ২৪২ বল মোকাবিলা করে ১৫টি চারের সাহায্যে ১৬০ রান করেন তিনি। নবম ব্যাটার হিসেবে আউট হওয়ার আগে পর্যন্ত ইংল্যান্ডের ইনিংসকে তিনি টেনে নিয়ে গেছেন একাই। এই ইনিংসের মধ্য দিয়ে নিজের ৬৭তম টেস্ট ফিফটি আগেই পূর্ণ করেছিলেন রুট। সেই সঙ্গে শচিন টেন্ডুলকারের টেস্ট ফিফটির রেকর্ডের আরও কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন তিনি। দ্বিতীয় ইনিংসে আরেকটি ফিফটি পেলে শচিনের ৬৮ ফিফটির মাইলফলক স্পর্শ করবেন ইংলিশ তারকা—এমন আলোচনাও শুরু হয়ে গেছে ক্রিকেটবিশ্বে।
অস্ট্রেলিয়ান বোলারদের মধ্যে মিচেল স্টার্ক, স্কট বোল্যান্ড ও নেসের চেষ্টা করেছেন লাইন-লেন্থ ধরে রাখতে। তবে রুটের দৃঢ়তা ভাঙা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। মাঝে মাঝে বৃষ্টি আর আলোর স্বল্পতাও ম্যাচের গতি ব্যাহত করেছে। প্রথম দিনের মতো দ্বিতীয় দিনেও আবহাওয়া বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে। তবুও রুট নিজের মনোযোগে কোনো ঘাটতি রাখেননি।
ইংল্যান্ডের ইনিংস শেষ পর্যন্ত থামে ৩৮৪ রানে। বর্তমান অ্যাশেজ সিরিজের প্রেক্ষাপটে এই রান নিঃসন্দেহে লড়াই করার মতো। অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপের বিপক্ষে এই স্কোর কতটা কার্যকর হবে, তা সময়ই বলবে। তবে মানসিক দিক থেকে এই ইনিংস ইংল্যান্ডকে বড় রকমের প্রেরণা দিয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
এই ম্যাচ শুধু রান আর উইকেটের হিসাব নয়, এটি একজন নেতার দায়িত্ব নেওয়ার গল্প। জো রুট আবারও দেখালেন, কেন তিনি আধুনিক ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ব্যাটার। চাপের মুহূর্তে দলের হাল ধরার ক্ষমতা, নিজের ইনিংসকে বড় করার মানসিকতা এবং শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ়তা—সব মিলিয়ে সিডনি টেস্টে রুটের এই ইনিংস অ্যাশেজ ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
একটি বাংলাদেশ অনলাইন-এর পর্যবেক্ষণে, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ইনিংস ইতোমধ্যেই ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। অনেক বিশ্লেষকই একে ‘ক্লাসিক জো রুট ইনিংস’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস শুরু হলে এই টেস্ট কোন দিকে মোড় নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে এটুকু নিশ্চিত, সিডনিতে ইংল্যান্ড যে লড়াই করে ছাড়বে—তার ভিত্তি গড়ে দিয়েছেন জো রুট।