প্রকাশ: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
লা লিগার শিরোপা লড়াইয়ে উত্তাপ আরও বাড়াল রিয়াল মাদ্রিদ। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনা আগের রাতেই জয় পেয়ে পয়েন্টের ব্যবধান সাতে নিয়ে গিয়েছিল। সেই ব্যবধান কমানোর চাপ ছিল কার্লো আনচেলত্তির শিষ্যদের ওপর। চাপের মুখে দারুণ এক পারফরম্যান্স উপহার দিল লস ব্লাঙ্কোস। নিজেদের ঘরের মাঠ সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে রিয়াল বেতিসকে ৫-১ গোলের বড় ব্যবধানে হারিয়ে শিরোপা দৌড়ে নতুন করে জানান দিল রিয়াল। ম্যাচের নায়ক নিঃসন্দেহে জোয়ান গার্সিয়া, যিনি কিলিয়ান এমবাপ্পের অনুপস্থিতিতে হ্যাটট্রিক করে আলো কেড়ে নেন।
এই জয় শুধু তিন পয়েন্টের নয়, বরং মানসিক দিক থেকেও রিয়ালের জন্য ছিল ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দলের সবচেয়ে বড় তারকা এমবাপ্পে না থাকলেও যে আক্রমণভাগ থেমে যায় না, সেটাই প্রমাণ করল এই ম্যাচ। বার্নাব্যুর গ্যালারি ভরা দর্শকরা শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক রিয়াল দেখেছেন, দেখেছেন দলগত ফুটবলের নিখুঁত প্রদর্শনী।
ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখল নেয় রিয়াল মাদ্রিদ। মাঝমাঠে টনি ক্রুস ও জুড বেলিংহ্যামের নিয়ন্ত্রণে বারবার চাপ সৃষ্টি করতে থাকে বেতিসের রক্ষণে। বেতিস কিছুটা রক্ষণাত্মক কৌশল নিয়ে খেললেও রিয়ালের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খায় তারা। প্রথম গোলের জন্য অবশ্য অপেক্ষা করতে হয় ২০ মিনিট পর্যন্ত। সেই গোলের শুরুটাও আসে রদ্রিগোর পা থেকে। ফ্রি-কিক নেন ব্রাজিলিয়ান এই উইঙ্গার, আর বক্সের ভেতরে দুর্দান্ত হেডে বল জালে পাঠান জোয়ান গার্সিয়া। বার্নাব্যু তখন গর্জে ওঠে, শুরু হয় গোল উৎসবের আভাস।
গোলের পরও থেমে থাকেনি রিয়াল। প্রথমার্ধে একাধিক সুযোগ তৈরি করে তারা। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও রদ্রিগো বারবার উইং দিয়ে ঢুকে পড়ছিলেন বেতিসের রক্ষণে। তবে ফিনিশিংয়ে কিছুটা ঘাটতির কারণে বিরতিতে যাওয়ার আগে আর গোল পায়নি স্বাগতিকরা। প্রথমার্ধ শেষ হয় ১-০ ব্যবধানে।
দ্বিতীয়ার্ধে যেন আরও আক্রমণাত্মক রূপে মাঠে নামে রিয়াল মাদ্রিদ। বিরতির পর মাত্র পাঁচ মিনিটেই আসে দ্বিতীয় গোল। এবার নিজেই সুযোগ তৈরি করে নেন জোয়ান গার্সিয়া। মাঝমাঠ থেকে বল পেয়ে ডি-বক্সের সামনে শক্তিশালী শট নেন তিনি, যা বেতিস গোলরক্ষকের হাত ছুঁয়ে জালে জড়িয়ে যায়। এই গোলে আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে যায় রিয়ালের, আর গার্সিয়া বুঝিয়ে দেন—এটা তারই রাত।
৫৬ মিনিটে স্কোরলাইন আরও বড় হয়। ডান প্রান্ত দিয়ে দুর্দান্ত এক ক্রস বাড়ান রদ্রিগো, আর বক্সের ভেতরে নিখুঁত টাইমিংয়ে লাফিয়ে উঠে হেড করেন রাউল অ্যাসেনসিও। বল সরাসরি জালে, স্কোরলাইন তখন ৩-০। বার্নাব্যুতে উৎসবের আমেজ, দর্শকরা দাঁড়িয়ে করতালি দিচ্ছিলেন তরুণ এই ডিফেন্ডারের গোলের জন্য।
তবে বেতিস পুরোপুরি হার মানেনি। ৬০ মিনিটে একটি গোল শোধ দেয় সফরকারীরা। হার্নান্দেসের শটে রিয়ালের রক্ষণ কিছুটা অসতর্ক ধরা পড়ে, আর সেই সুযোগেই গোল করে ব্যবধান কমান তিনি। এই গোল কিছুক্ষণের জন্য ম্যাচে সামান্য উত্তেজনা ফিরিয়ে আনলেও রিয়ালের আক্রমণের ধার থামাতে পারেনি বেতিস।
ম্যাচের শেষ ভাগে আবারও আলো কেড়ে নেন জোয়ান গার্সিয়া। ৮২ মিনিটে ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়ানোর কাছ থেকে বল পেয়ে ঠান্ডা মাথায় ফিনিশিং করেন তিনি। এই গোলে পূর্ণ হয় তার হ্যাটট্রিক। পুরো স্টেডিয়াম তখন দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানায় এই তরুণ ফরোয়ার্ডকে। এমবাপ্পে না থাকলেও যে নতুন নায়ক তৈরি হচ্ছে, এই মুহূর্তে সেটাই যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখালেন গার্সিয়া।
গোল উৎসব এখানেই থামেনি। যোগ করা সময়ে রিয়ালের হয়ে পঞ্চম গোলটি করেন ফ্রান্সিসকো গার্সিয়া। বাম প্রান্ত দিয়ে আক্রমণে উঠে দুর্দান্ত এক শটে তিনি বল জালে পাঠান। শেষ পর্যন্ত ৫-১ গোলের বিশাল জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে রিয়াল মাদ্রিদ।
এই ম্যাচে রিয়ালের দলগত পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো। রক্ষণ থেকে আক্রমণ—সব জায়গাতেই ছিল সমন্বয়। এমবাপ্পের অনুপস্থিতিতে অনেকেই ভেবেছিলেন রিয়ালের আক্রমণভাগ হয়তো কিছুটা ভাটা পড়বে। কিন্তু গার্সিয়া, রদ্রিগো, ভিনিসিয়ুসদের পারফরম্যান্স দেখিয়ে দিল, এই দলটি শুধু একজন তারকার ওপর নির্ভরশীল নয়।
এই জয়ের ফলে লিগ টেবিলের চিত্রও আরও রোমাঞ্চকর হয়ে উঠেছে। ১৯ ম্যাচে ১৬ জয় ও এক ড্রয়ে বার্সেলোনার সংগ্রহ ৪৯ পয়েন্ট। সমান ম্যাচে ১৪ জয় ও তিন ড্রয়ে রিয়াল মাদ্রিদের পয়েন্ট দাঁড়িয়েছে ৪৫। অর্থাৎ শীর্ষে থাকা বার্সেলোনার সঙ্গে ব্যবধান এখন মাত্র চার পয়েন্ট। লিগ এখনও অনেক বাকি, আর এই ব্যবধান যে সহজেই কমানো সম্ভব, সেটাই বিশ্বাস করছে রিয়াল শিবির।
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে রিয়াল কোচ কার্লো আনচেলত্তি গার্সিয়ার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন। তিনি বলেন, দল হিসেবে সবাই ভালো খেলেছে, তবে গার্সিয়া আজ পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। এমবাপ্পে না থাকলেও খেলোয়াড়রা দায়িত্ব নিয়েছে, সেটাই সবচেয়ে ইতিবাচক দিক। অন্যদিকে বেতিস কোচ স্বীকার করেন, রিয়ালের গতির সঙ্গে তারা তাল মেলাতে পারেনি।
এই জয় শুধু পয়েন্ট টেবিলের হিসাব বদলায়নি, বরং রিয়াল মাদ্রিদের আত্মবিশ্বাসও নতুন করে চাঙ্গা করেছে। সামনে কঠিন ম্যাচ অপেক্ষা করছে, ইউরোপীয় মঞ্চেও ব্যস্ত সূচি। তার আগে এমন একটি বড় জয় নিঃসন্দেহে রিয়ালের জন্য টনিকের মতো কাজ করবে।
একটি বাংলাদেশ অনলাইন-এর পর্যবেক্ষণে, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া গণমাধ্যমেও এই ম্যাচ নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে। বিশেষ করে জোয়ান গার্সিয়ার হ্যাটট্রিক নিয়ে প্রশংসা হচ্ছে সর্বত্র। অনেক বিশ্লেষকই বলছেন, লা লিগার শিরোপা লড়াই এখনও শেষ হয়নি, আর রিয়াল মাদ্রিদ এই জয় দিয়ে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে—শেষ পর্যন্ত লড়াইয়ের জন্য তারা পুরোপুরি প্রস্তুত।