দ্বিতীয় সপ্তাহে ইরানের বিক্ষোভ, প্রাণ গেল অন্তত ১২ জনের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৫ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫২ বার
দ্বিতীয় সপ্তাহে ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিহত অন্তত ১২

প্রকাশ: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। মানবাধিকার সংগঠন এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর নতুন করে সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যও রয়েছেন বলে সরকারি সূত্রে জানা গেছে। গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানে দোকানদারদের ধর্মঘট থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে এবং তা ইরানের ক্ষমতাকাঠামোর জন্য একটি নতুন ও গুরুতর চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

মার্কিনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানিয়েছে, রোববার রাতভর রাজধানী তেহরানসহ দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর শিরাজ এবং পশ্চিম ইরানের একাধিক এলাকায় ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। এসব বিক্ষোভে অংশ নেওয়া মানুষজন ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ধর্মীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সরাসরি স্লোগান দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় নেমে সরকারবিরোধী স্লোগান দিচ্ছেন, আর নিরাপত্তা বাহিনী কাঁদানে গ্যাস, লাঠিচার্জ এবং কোথাও কোথাও গুলিবর্ষণের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।

এই বিক্ষোভকে ২০২২–২০২৩ সালের দেশব্যাপী আন্দোলনের পর সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী আন্দোলন হিসেবে বিবেচনা করছেন বিশ্লেষকরা। ২০২২ সালে পুলিশ হেফাজতে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা ইরানের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল শাসকগোষ্ঠীর জন্য। নারীদের কঠোর পোশাকবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে আটক হওয়ার পর তার মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেই আন্দোলন কয়েক মাস ধরে চলেছিল এবং দেশজুড়ে ব্যাপক দমন-পীড়নের মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। বর্তমান বিক্ষোভ এখনো সেই মাত্রায় না পৌঁছালেও, অনেকের মতে এটি আবারও সেই স্মৃতি জাগিয়ে তুলছে।

সাম্প্রতিক আন্দোলন মূলত পশ্চিম ইরানের কুর্দি ও লোর অধ্যুষিত এলাকায় কেন্দ্রীভূত থাকলেও এর প্রভাব রাজধানী তেহরানসহ বড় শহরগুলোতেও অনুভূত হচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠন হেনগাও জানিয়েছে, শনিবার পশ্চিমাঞ্চলীয় ইলাম প্রদেশের মালেকশাহি এলাকায় বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালালে কুর্দি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের চারজন নিহত হয়। সংগঠনটির দাবি, আরও দুজন নিহত হওয়ার খবর যাচাই করা হচ্ছে এবং বহু মানুষ আহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানানো হয়েছে।

হেনগাও আরও অভিযোগ করেছে, সংঘর্ষের পর হাসপাতালগুলো থেকে নিহতদের মরদেহ জব্দ করেছে নিরাপত্তা বাহিনী, যাতে মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা ও পরিস্থিতি বাইরে প্রকাশ না পায়। এই অভিযোগ ইরানে আগেও বিভিন্ন আন্দোলনের সময় উঠেছে এবং তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে।

নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটসও পৃথক এক প্রতিবেদনে চারজন নিহত ও অন্তত ৩০ জন আহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছে। সংস্থাটি জানায়, নিহতদের জানাজায় অংশগ্রহণকারীরা সরকার ও সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিবিরোধী স্লোগান দিয়েছেন। এতে বোঝা যাচ্ছে, শুধু রাস্তায় নয়, সামাজিক ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানেও সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ পাচ্ছে।

অন্যদিকে, ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ভিন্ন ভাষ্য তুলে ধরেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “দাঙ্গাকারীদের” সঙ্গে সংঘর্ষে এক নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছে এবং দুই হামলাকারীও প্রাণ হারিয়েছে। সরকারপন্থী সংবাদমাধ্যমগুলো বিক্ষোভকারীদের বিদেশি মদদপুষ্ট বলে আখ্যা দিচ্ছে এবং দাবি করছে, দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতেই এই সহিংসতা উসকে দেওয়া হচ্ছে।

তেহরানে শনিবার রাতে শহরের পূর্ব, পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলে বিক্ষিপ্ত বিক্ষোভ হয়েছে বলে ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে। রোববার রাজধানীতে অধিকাংশ দোকান খোলা থাকলেও রাস্তাঘাট ছিল তুলনামূলকভাবে ফাঁকা। গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোড়ে দাঙ্গা পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়, যা রাজধানীর সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তার অনুভূতি আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

এই বিক্ষোভ এমন এক সময়ে শুরু হয়েছে, যখন ইরান অর্থনৈতিক সংকট, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জে জর্জরিত। জুন মাসে ইসরাইলের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতে ইরানের কিছু পারমাণবিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং নিরাপত্তা বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এর ওপর মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ দীর্ঘদিন ধরেই জমে ছিল।

এই প্রেক্ষাপটে রোববার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি ঘোষণা দেন, অর্থনৈতিক চাপ কমাতে আগামী চার মাস নাগরিকদের মাসে প্রায় সাত ডলার সমপরিমাণ ভাতা দেওয়া হবে। যদিও সরকার এটিকে সহায়তা হিসেবে তুলে ধরছে, অনেক অর্থনীতিবিদ ও নাগরিক বলছেন, বর্তমান মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে এই পরিমাণ অর্থ কার্যত অপ্রতুল এবং তা মানুষের ক্ষোভ প্রশমনে যথেষ্ট হবে না।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ইরানের পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, বিক্ষোভে আরও মানুষ নিহত হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে “খুব কঠোরভাবে আঘাত করবে।” এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করছে এবং আগের মতো যদি ইরানি কর্তৃপক্ষ মানুষ হত্যা শুরু করে, তাহলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ট্রাম্পের এই মন্তব্য নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই বিক্ষোভ শুধু অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং এর আন্তর্জাতিক প্রভাবও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে পারে, যা দেশটির অর্থনীতি ও কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও দুর্বল করতে পারে।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন-এর পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানের বিক্ষোভ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেক ইরানি নাগরিক বিদেশে বসে আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছেন, আবার দেশটির ভেতরে তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে দেওয়া বা আংশিকভাবে বন্ধ করার অভিযোগও উঠেছে।

সব মিলিয়ে, দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করা এই বিক্ষোভ ইরানের শাসনব্যবস্থার জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে। আন্দোলন কোন দিকে মোড় নেবে, সরকার কতটা কঠোর দমননীতি গ্রহণ করবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কী ভূমিকা নেবে—এসব প্রশ্নের উত্তরই এখন নির্ধারণ করবে ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত