প্রকাশ: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় ফোরামে সহযোগিতা ও সমন্বয় আরও জোরদার করতে সম্মত হয়েছে চীন ও পাকিস্তান। দুই দেশের দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদারিত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলোতে এই অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ ইসহাক দারের সাম্প্রতিক চীন সফর ঘিরে প্রকাশিত একাধিক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রেক্ষাপটে এই বৈঠকগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বেইজিংয়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইয়ের সঙ্গে বৈঠকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নানা ইস্যুতে বিস্তারিত আলোচনা করেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রকাশিত বিবৃতিতে জানানো হয়, বৈঠকে চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি), দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতা নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে। উভয় পক্ষই মত দেন, বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে পারস্পরিক সমন্বয় ও সহযোগিতা আরও বাড়ানো সময়ের দাবি।
চীন–পাকিস্তান সম্পর্ককে দুই দেশই “সব আবহাওয়ার কৌশলগত অংশীদারিত্ব” হিসেবে বর্ণনা করে আসছে। এই সম্পর্ক শুধু দ্বিপক্ষীয় পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নয়; বরং আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রেও এর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। বৈঠকে দুই দেশের নেতারা একমত হন যে, বৃহত্তর অঞ্চলের শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে এই বন্ধুত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এবং ভবিষ্যতেও করবে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, দুই দেশ চীন–পাকিস্তান কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৭৫তম বার্ষিকী যথাযথ মর্যাদা ও গুরুত্বের সঙ্গে উদযাপন করতে সম্মত হয়েছে। এই উপলক্ষে যৌথ কর্মসূচি, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং উচ্চপর্যায়ের সফরের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। কূটনৈতিক সম্পর্কের এই দীর্ঘ পথচলায় পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা এবং রাজনৈতিক সমর্থনকে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন উভয় পক্ষ।
সিপিইসি নিয়ে আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পকে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বৈঠকে সিপিইসির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়ন, শিল্পায়ন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং জ্বালানি ও পরিবহন খাতে নতুন উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়ে মতবিনিময় হয়। পাকিস্তান পক্ষ জানায়, তারা চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে আগ্রহী। চীনও পাকিস্তানের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নে অব্যাহত সহযোগিতার আশ্বাস পুনর্ব্যক্ত করে।
ইসহাক দারের সফরের অংশ হিসেবে তিনি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইক্সিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তিনি চীনা কমিউনিস্ট পার্টিকে তাদের ২০তম কেন্দ্রীয় কমিটির চতুর্থ পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন সফলভাবে আয়োজনের জন্য অভিনন্দন জানান। আলোচনায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। উভয় পক্ষই মত দেন, দলীয় পর্যায়ের সম্পর্ক রাষ্ট্রীয় সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
এছাড়া, পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী চীনের নির্বাহী ভাইস প্রিমিয়ার ডিং জুয়েক্সিয়াংয়ের সঙ্গেও বৈঠক করেন। এই বৈঠকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, উন্নয়ন অংশীদারিত্ব এবং কৌশলগত সমন্বয় নিয়ে আলোচনা হয়। দুই দেশের নেতারা পাকিস্তান–চীন কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও গভীর করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন এবং ভবিষ্যতে উচ্চপর্যায়ের সংলাপ অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সফর ও বৈঠকগুলো দক্ষিণ এশিয়া ও বৃহত্তর এশিয়া–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। একদিকে যেমন বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন আসছে, অন্যদিকে তেমনি আঞ্চলিক জোট ও অংশীদারিত্বের গুরুত্ব বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে চীন ও পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা দুই দেশের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের জন্য চীন কেবল একটি অর্থনৈতিক অংশীদার নয়, বরং কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থনেরও গুরুত্বপূর্ণ উৎস। অন্যদিকে চীনের দৃষ্টিকোণ থেকে পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে একটি কৌশলগত সেতুবন্ধন। সিপিইসি সেই কৌশলগত চিন্তারই বাস্তব রূপ।
বৈঠকে বহুপক্ষীয় ফোরামগুলোর কথাও গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। জাতিসংঘ, সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে পারস্পরিক সমর্থন ও সমন্বয় অব্যাহত রাখার বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়। আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পরস্পরের অবস্থানকে সম্মান করা এবং প্রয়োজনে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
সব মিলিয়ে, ইসহাক দারের চীন সফর আবারও প্রমাণ করল যে চীন–পাকিস্তান সম্পর্ক কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এক গভীর অংশীদারিত্ব। দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদারের এই ঐকমত্য ভবিষ্যতে আঞ্চলিক রাজনীতি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।