প্রকাশ: ০৫ জানুয়ারী ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সোমবার রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে এই শোকবার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়। রাষ্ট্রীয় শিষ্টাচার ও সৌজন্য বজায় রেখে প্রধান উপদেষ্টার পক্ষ থেকে পাঠানো এই শোকবার্তা দেশের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ মানবিক মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রধান উপদেষ্টার একান্ত সচিব সজিব এম খায়রুল ইসলাম ও সহকারী প্রেস সচিব নাঈম আলী গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে তারেক রহমানের হাতে শোকবার্তাটি হস্তান্তর করেন। এ সময় বিএনপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা ও দলীয় কর্মকর্তাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। শোকবার্তা গ্রহণের সময় পরিবেশ ছিল ভারী ও নীরব, যা প্রিয় নেত্রী হারানোর বেদনা এবং রাজনৈতিক শালীনতার এক সম্মিলিত প্রতিফলন হিসেবে দেখা যায়।
শোকবার্তায় ড. মুহাম্মদ ইউনূস বেগম খালেদা জিয়ার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। একই সঙ্গে তিনি শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজন, বিএনপির নেতাকর্মী এবং তার অসংখ্য অনুসারীর প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। শোকবার্তায় উল্লেখ করা হয়, দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, যার নেতৃত্ব ও ভূমিকা বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক পরিসরে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়—এমন মন্তব্য করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি একাধিকবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছেন এবং একই সঙ্গে বিরোধী রাজনীতির নেতৃত্ব দিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন ছিল নানা উত্থান-পতন, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং বিতর্কে ভরা, যা তাকে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য রাজনৈতিক চরিত্রে পরিণত করেছে।
প্রধান উপদেষ্টার পাঠানো শোকবার্তাকে অনেকেই রাজনৈতিক সৌহার্দ্য ও মানবিকতার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন। মতাদর্শগত ভিন্নতা সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে এই ধরনের শোক ও সমবেদনা জানানোর ঘটনাকে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অংশ হিসেবে উল্লেখ করছেন তারা। রাজনৈতিক অঙ্গনের পর্যবেক্ষকদের মতে, এমন বার্তা দেশের রাজনীতিতে সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ জোরদার করতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
তারেক রহমানের কাছে শোকবার্তা পৌঁছে দেওয়ার ঘটনাটি বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যেও আবেগঘন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। দলীয় সূত্র জানায়, প্রধান উপদেষ্টার এই শোকবার্তাকে তারা সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন এবং এটিকে একটি রাষ্ট্রীয় ও মানবিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে দেখছেন। তারেক রহমান নিজেও শোকবার্তা গ্রহণের সময় প্রধান উপদেষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি শুধু একটি দলের নেতা নন, বরং একটি সময়ের প্রতীক ছিলেন। সামরিক শাসন-পরবর্তী বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিকাশে তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। বিএনপির নেতৃত্বে তিনি একাধিকবার সরকার গঠন করেছেন এবং দেশের অর্থনীতি, অবকাঠামো ও পররাষ্ট্রনীতিতে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা আজও আলোচনার বিষয় হয়ে আছে।
তার মৃত্যুতে শুধু বিএনপি নয়, দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের বিভিন্ন স্তরে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা শোক প্রকাশ করেছেন। অনেকেই তার রাজনৈতিক অবদান স্মরণ করে বলেছেন, মতপার্থক্য থাকলেও একজন প্রবীণ রাজনীতিক হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো সকলের দায়িত্ব।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শোকবার্তা সেই সামগ্রিক শোকপ্রকাশের ধারাবাহিকতারই একটি অংশ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি জাতীয় ঐক্য, সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বক্তব্য দিয়ে আসছেন। তার পাঠানো এই শোকবার্তা সেই অবস্থানেরই প্রতিফলন বলে মনে করছেন অনেকে।
গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে শোকবার্তা পৌঁছে দেওয়ার পরপরই সেখানে নেতাকর্মীদের ভিড় আরও বাড়তে থাকে। তারা প্রিয় নেত্রীর স্মৃতিচারণা করেন এবং শোকাহত পরিবারের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। অনেকের চোখে ছিল অশ্রু, আবার অনেকেই নীরবে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি যুগের অবসান নির্দেশ করে। তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ধারা, আন্দোলন ও সাংগঠনিক কাঠামো আগামী দিনে কীভাবে রূপ নেবে, তা এখন সময়ই বলে দেবে। তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—শোকের এই সময়ে রাজনৈতিক সহনশীলতা ও মানবিকতা বজায় রাখা।
সব মিলিয়ে, তারেক রহমানের কাছে প্রধান উপদেষ্টার শোকবার্তা পৌঁছে দেওয়ার ঘটনাটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মানবিক মূল্যবোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। শোকের এই সময়ে দেশবাসী আশা করছে, প্রিয় নেত্রী হারানোর বেদনা কাটিয়ে উঠে রাজনৈতিক অঙ্গন আরও দায়িত্বশীল ও সংযত ভূমিকা পালন করবে।