সাগর-রুনি হত্যা মামলা: ১২৩ বার পেছালো তদন্ত প্রতিবেদন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৫ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৯ বার
সাগর-রুনি হত্যা মামলা: ১২৩ বার পেছালো তদন্ত প্রতিবেদন

প্রকাশ: ০৫ জানুয়ারী ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজকে দীর্ঘদিন ধরে তাড়িয়ে বেড়ানো এক অমীমাংসিত ও আলোচিত অধ্যায়—সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলা। আবারও সেই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ পেছানো হয়েছে। এবার নতুন করে আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেছেন আদালত। এর মধ্য দিয়ে চাঞ্চল্যকর এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা মোট ১২৩ বার পেছানো হলো, যা দেশের বিচার ইতিহাসে এক অনন্য ও উদ্বেগজনক নজির হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সোমবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুব আলমের আদালত এ আদেশ দেন। এদিন মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন ধার্য ছিল। তবে তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আজিজুল হক আদালতে কোনো প্রতিবেদন দাখিল করতে ব্যর্থ হন। তদন্তের অগ্রগতি তুলে ধরতে না পারায় আদালত নতুন করে আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।

সাগর-রুনি হত্যা মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে শুধু নিহত পরিবারের নয়, গোটা সাংবাদিক সমাজ ও সচেতন নাগরিকদের কাছে এক গভীর বেদনা ও ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় নির্মমভাবে খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সারোয়ার এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। নিজ বাসায় রাতের আঁধারে নৃশংস এই হত্যাকাণ্ড দেশের মানুষকে হতবাক করে দেয়। ওই ঘটনায় তাদের একমাত্র সন্তান মাহির (তখন বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বছর) অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যায়।

হত্যাকাণ্ডের পরদিন নিহত রুনির ভাই নওশের আলম রোমান শেরেবাংলা নগর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। শুরুতে মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় থানার এক উপ-পরিদর্শককে। তবে ঘটনার ভয়াবহতা ও দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে মাত্র চার দিনের মাথায় তদন্তভার হস্তান্তর করা হয় ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)-এর কাছে।

ডিবি প্রায় দুই মাসের বেশি সময় তদন্ত চালালেও হত্যার রহস্য উদঘাটনে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। তদন্তে বারবার ব্যর্থতার অভিযোগ ওঠায় এবং জনমনে ক্ষোভ বাড়তে থাকায় হাইকোর্টে রিট করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল হাইকোর্টের নির্দেশে মামলার তদন্তভার র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)-এর কাছে হস্তান্তর করা হয়।

র‍্যাব তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর বিভিন্ন সময়ে আশার কথা শোনালেও বাস্তবে মামলার কোনো চূড়ান্ত অগ্রগতি হয়নি। বছরের পর বছর পার হলেও তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি। বরং একের পর এক তারিখ পিছিয়েছে। এ পর্যন্ত ১২৩ বার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় পেছানো হয়েছে, যা বিচারপ্রার্থীদের জন্য হতাশাজনক এবং ন্যায়বিচার প্রক্রিয়ার ওপর আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

এই মামলায় এখন পর্যন্ত যাদের আসামি করা হয়েছে তারা হলেন রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মাসুম মিন্টু, কামরুল ইসলাম ওরফে অরুন, আবু সাঈদ, নিহত দম্পতির বাড়ির দুই নিরাপত্তারক্ষী পলাশ রুদ্র পাল ও এনায়েত আহমেদ এবং তাদের পরিচিত তানভীর রহমান খান। আসামিদের মধ্যে তানভীর রহমান খান ও পলাশ রুদ্র পাল বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। অপরদিকে বাকি আসামিরা কারাগারে আটক আছেন বলে জানা গেছে।

দীর্ঘ তদন্তকালেও মামলার মূল রহস্য উদঘাটন না হওয়ায় নিহতের পরিবার বারবার হতাশা প্রকাশ করেছে। একাধিকবার তারা গণমাধ্যমে অভিযোগ করেছেন, তদন্তের ধীরগতি ও বারবার সময় বাড়ানোর কারণে তারা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একই সঙ্গে সাংবাদিক সমাজও বিভিন্ন সময়ে মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ ও কর্মসূচির মাধ্যমে দ্রুত তদন্ত শেষ করে বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে এসেছে।

এই প্রেক্ষাপটে গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্তে এক গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেন হাইকোর্ট। মামলার দীর্ঘসূত্রতা ও তদন্তে অগ্রগতির অভাব বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন বাহিনীর অভিজ্ঞ তদন্ত কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে হাইকোর্ট র‍্যাবকে এ মামলার তদন্ত থেকে সরিয়ে দেওয়ার আদেশ দেন।

বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি মুহাম্মদ মাহবুব উল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের শুনানি শেষে এই আদেশ দেন। আদালত নির্দেশ দেন, গঠিত টাস্কফোর্সকে ছয় মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হবে এবং অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত আদালতকে জানাতে হবে। এ বিষয়ে পরবর্তী আদেশের জন্য আগামী ৬ এপ্রিল দিন ধার্য করা হয়।

এর ধারাবাহিকতায় গত ১৭ অক্টোবর হাইকোর্টের নির্দেশ অনুসারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে চার সদস্যের উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। এতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর প্রধানকে আহ্বায়ক করা হয়। আশা করা হয়েছিল, এই টাস্কফোর্সের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটবে এবং অবশেষে সাগর-রুনি হত্যার রহস্য উন্মোচিত হবে।

তবে বাস্তবতা হলো, টাস্কফোর্স গঠনের পরও তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ বারবার পেছানো হচ্ছে। সর্বশেষ ১২৩ বার সময় পেছানোর ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—আদৌ কি এই মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার সম্ভব হবে? নাকি এটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার আরেকটি দীর্ঘসূত্রতার প্রতীক হয়ে থাকবে?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি হত্যা মামলায় এত দীর্ঘ সময় ধরে তদন্ত ঝুলে থাকা শুধু ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য নয়, রাষ্ট্রের আইনি কাঠামো ও জবাবদিহির জন্যও অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সাংবাদিক দম্পতি হত্যার মতো সংবেদনশীল ও বহুল আলোচিত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি না হওয়া ভবিষ্যতে পেশাগত নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করছে।

সব মিলিয়ে, সাগর-রুনি হত্যা মামলা এখন কেবল একটি বিচারাধীন মামলা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের বিচারপ্রক্রিয়ার সক্ষমতা, স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতার এক বড় পরীক্ষা। ১২৩ বার তদন্ত প্রতিবেদন পেছানোর পরও দেশবাসীর প্রত্যাশা—একদিন সত্য উদঘাটিত হবে এবং এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত