প্রকাশ: ০৫ জানুয়ারী ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিচারালয় সুপ্রিম কোর্টকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে প্রচারিত কিছু অসত্য ও বিভ্রান্তিকর সংবাদকে ঘিরে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। ভবিষ্যতে সুপ্রিম কোর্ট-সংক্রান্ত কোনো মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর বা অসত্য সংবাদ প্রকাশ বা প্রচার করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানকে আদালত অবমাননার দায়ে আইনানুগভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে—এমন স্পষ্ট ও কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে প্রশাসন। এই সতর্কতা দেশের গণমাধ্যম, সাংবাদিকতা ও বিচার বিভাগের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সোমবার, ৫ জানুয়ারি, সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী স্বাক্ষরিত এক আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিতে এ সতর্কতা জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট-সংক্রান্ত যেকোনো সংবাদ প্রকাশ বা প্রচারের আগে গণমাধ্যমকর্মীদের অবশ্যই সুপ্রিম কোর্টের মিডিয়া ফোকাল পার্সন অথবা রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় থেকে সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা ও সত্যতা যাচাই করতে হবে। এই নির্দেশনা অমান্য করে ভবিষ্যতে যদি কোনো মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর বা অসত্য তথ্য প্রকাশিত হয়, তবে সেটিকে আদালত অবমাননাকর কার্যক্রম হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছে, সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে এমন কিছু সংবাদ প্রচারিত হয়েছে, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসত্য। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং বেঞ্চ প্রদান না করায় আপিল বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ও হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতি ছুটিতে গিয়েছেন—এমন সংবাদ। এসব তথ্য টিভি স্ক্রলসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হলেও বাস্তবতার সঙ্গে এর কোনো মিল নেই বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের ভাষায়, এ ধরনের সংবাদ শুধু বিভ্রান্তিকরই নয়, বরং অত্যন্ত দুঃখজনক। কারণ, দেশের সর্বোচ্চ আদালত সম্পর্কে অসত্য তথ্য প্রচার হলে জনমনে ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টি হয়। এতে করে বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা, মর্যাদা ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বিচার বিভাগ একটি মৌলিক স্তম্ভ। সেই স্তম্ভকে ঘিরে বিভ্রান্তি ছড়ানো হলে তা শুধু আদালতের জন্য নয়, পুরো রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্যই ক্ষতিকর।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, সুপ্রিম কোর্ট সম্পর্কে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য পরিবেশন করা সরাসরি আদালত অবমাননার শামিল। আদালতের কার্যক্রম, বিচারপতিদের অবস্থান কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ভুল তথ্য প্রচার আইনত গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। অথচ সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমকর্মীরা যদি সংবাদ প্রকাশের আগে সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রি বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্যের সত্যতা যাচাই করতেন, তাহলে এ ধরনের অনভিপ্রেত পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না।
সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন বিজ্ঞপ্তিতে আলোচিত বিচারপতিদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যাও দিয়েছে। এতে জানানো হয়, আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম তার মায়ের অসুস্থতাজনিত কারণে নিয়মমাফিক ছুটি গ্রহণ করেছেন। একইভাবে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ফরিদ আহমেদ নিজ শারীরিক অসুস্থতার কারণে হাসপাতালে ভর্তি থাকায় সাময়িকভাবে বিচারকার্যে অংশ নিতে পারছেন না। এই দুটি বিষয় সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত এবং এর সঙ্গে গণমাধ্যমে প্রচারিত জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন বা বেঞ্চ না পাওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই।
আইন বিশ্লেষকদের মতে, সুপ্রিম কোর্টের এই সতর্কতা সময়োপযোগী এবং প্রয়োজনীয়। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের বিস্তারের ফলে যাচাই-বাছাই ছাড়াই অনেক তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। কখনো কখনো এসব তথ্য মূলধারার গণমাধ্যমেও জায়গা করে নিচ্ছে, যা বিভ্রান্তির মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে বিচার বিভাগের মতো সংবেদনশীল ও আস্থাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ভুল সংবাদ জনমনে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি হলো সত্য, নিরপেক্ষতা ও দায়িত্বশীলতা। সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের একটি অপরিহার্য উপাদান হলেও সেই স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও সমানভাবে জড়িত। বিচার বিভাগ সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন, কারণ একটি ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্য বিচারপ্রক্রিয়া ও বিচারকদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত সম্মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের এই বিজ্ঞপ্তি মূলত গণমাধ্যমের প্রতি একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে—সত্য যাচাই ছাড়া কোনো সংবাদ প্রচার করা যাবে না, বিশেষ করে যখন তা দেশের সর্বোচ্চ আদালতকে কেন্দ্র করে। একই সঙ্গে এটি আদালতের মর্যাদা রক্ষা ও জনআস্থা বজায় রাখার ক্ষেত্রে প্রশাসনের দৃঢ় অবস্থানকেও তুলে ধরে।
এদিকে, দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মী সংগঠন ও সিনিয়র সাংবাদিকরা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। অনেকেই মনে করছেন, এই সতর্কতা সাংবাদিকদের জন্য একটি আত্মসমালোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। ভবিষ্যতে যাতে যাচাইহীন বা গুজবনির্ভর তথ্য সংবাদ হিসেবে প্রকাশ না পায়, সে বিষয়ে আরও পেশাদার আচরণ প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, সুপ্রিম কোর্টকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিভ্রান্তিকর সংবাদ এবং তার প্রেক্ষিতে প্রশাসনের কঠোর সতর্কতা বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও বিচার বিভাগের সম্পর্কের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি একদিকে যেমন বিচার বিভাগের মর্যাদা রক্ষার প্রয়াস, অন্যদিকে তেমনি দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার গুরুত্বও নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়। ভবিষ্যতে এই নির্দেশনা কতটা কার্যকরভাবে অনুসরণ করা হয়, সেটির ওপর নির্ভর করবে গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং বিচার বিভাগের প্রতি জনআস্থার দৃঢ়তা।