নোবেল ইস্যুতে মাচাদোকে উপেক্ষার অভিযোগ নাকচ ট্রাম্পের

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৫ বার
নোবেল ইস্যুতে মাচাদোকে উপেক্ষার অভিযোগ নাকচ ট্রাম্পের

প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভেনেজুয়েলার রাজনীতি, নোবেল শান্তি পুরস্কার এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক অবস্থান—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক। নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রহণের কারণে মাচাদোকে ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে—এমন অভিযোগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট। তবে এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন ট্রাম্প। যদিও তিনি স্পষ্ট ভাষায় মন্তব্য করেছেন, মাচাদোর নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া তার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি।

ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ভেনেজুয়েলার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটে বিরোধী আন্দোলনের মুখ হিসেবে পরিচিত মারিয়া কোরিনা মাচাদো নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের সঙ্গে তার সম্পর্ক প্রত্যাশিত মাত্রায় এগোয়নি। প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়, ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে এই পুরস্কার নিয়ে অসন্তোষ ছিল, যার প্রভাব পড়েছে ভেনেজুয়েলা বিষয়ে নীতিনির্ধারণের আলোচনায়। বিশেষ করে ট্রাম্প নিজে অতীতে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করায় বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছর প্রকাশ্যেই একাধিকবার দাবি করেছিলেন যে আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকার জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার তার প্রাপ্য। মধ্যপ্রাচ্য, কোরীয় উপদ্বীপ ও লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক তৎপরতার কথা উল্লেখ করে তিনি নিজেকে এই পুরস্কারের যোগ্য বলে মন্তব্য করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নোবেল কমিটি পুরস্কারটি প্রদান করে ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে, যিনি দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত।

ওয়াশিংটন পোস্টকে দেওয়া এক মন্তব্যে হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা দাবি করেন, মাচাদো যদি নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রহণের সময় প্রকাশ্যে বলতেন যে এই সম্মান আসলে ট্রাম্পের প্রাপ্য, তাহলে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সমর্থনের দিক থেকে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ভিন্ন হতে পারত। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, মাচাদোর এই পুরস্কার গ্রহণ ট্রাম্প প্রশাসনের চোখে একটি ‘রাজনৈতিক ভুল’ বা ‘পাপ’ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। যদিও এই বক্তব্যকে আনুষ্ঠানিক অবস্থান হিসেবে স্বীকার করেনি হোয়াইট হাউজ।

তবে এসব অভিযোগ ও বক্তব্যের জবাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্টভাবে বলেন, মাচাদোর নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া তার ব্যক্তিগত পছন্দ নয়, কিন্তু এর সঙ্গে ভেনেজুয়েলা সংক্রান্ত মার্কিন সিদ্ধান্তের কোনো সম্পর্ক নেই। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কোনো ব্যক্তির পুরস্কার বা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ওপর নির্ভর করে না। তার দাবি, ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলা বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয় দেশটির অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করে।

এই বিতর্কের প্রেক্ষাপটে ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে। গত শুক্রবার গভীর রাতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করতে দেশটিতে অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী ডেল্টা ফোর্স—এমন খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। যদিও অভিযান ও আটকের বিষয়ে ভেনেজুয়েলা সরকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে, তবুও ঘটনাটি লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে মারিয়া কোরিনা মাচাদো জানান, ভেনেজুয়েলার জনগণ পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত এবং বিরোধীরা এখন ক্ষমতা গ্রহণের জন্য সংগঠিত। তার বক্তব্যে নতুন সরকারের রূপরেখা ও গণতান্ত্রিক রূপান্তরের আশাবাদ ফুটে ওঠে। মাচাদোর সমর্থকেরা এই পোস্টকে দীর্ঘদিনের আন্দোলনের একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন।

তবে একই দিন এক সংবাদ সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সম্ভাবনাকে নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, মাচাদোর ভেনেজুয়েলা শাসন করার মতো সক্ষমতা নেই এবং দেশটির ভেতরে তার পর্যাপ্ত জনসমর্থন বা গ্রহণযোগ্যতাও প্রশ্নবিদ্ধ। ট্রাম্পের এই বক্তব্য ভেনেজুয়েলার বিরোধী শিবিরে হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।

বিশ্লেষকদের মতে, নোবেল শান্তি পুরস্কারকে কেন্দ্র করে এই বিতর্ক আসলে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের প্রতিফলন। ভেনেজুয়েলা দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে। মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা, বিরোধী আন্দোলনের প্রতি সমর্থন এবং সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের অভিযোগ—সব মিলিয়ে দেশটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক স্পর্শকাতর বিন্দুতে অবস্থান করছে। এর মধ্যে মাচাদোর নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া তাকে আন্তর্জাতিকভাবে আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

মানবাধিকারকর্মীরা মনে করছেন, নোবেল শান্তি পুরস্কার কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না, তবে এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি বার্তা বহন করে। মাচাদোর ক্ষেত্রে এই পুরস্কার ভেনেজুয়েলায় গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রশ্নকে নতুন করে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছে। অন্যদিকে, ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নোবেল পুরস্কারকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বিতর্কের ধারাবাহিকতা হিসেবেই দেখছেন অনেকে।

সব মিলিয়ে, নোবেল শান্তি পুরস্কারকে কেন্দ্র করে ট্রাম্প ও মাচাদোর মধ্যে দূরত্বের অভিযোগ, ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে মিলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নির্ভর করছে ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ, যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবস্থানের ওপর। আপাতত, নোবেল ইস্যুতে ট্রাম্পের অস্বীকৃতি ও মন্তব্য বিশ্বরাজনীতির আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত