প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশজুড়ে এখন শীত যেন কেবল একটি ঋতু নয়, বরং এক ধরনের নীরব দুর্যোগে রূপ নিয়েছে। দিনের আলো আর রাতের অন্ধকারের মধ্যে তাপমাত্রার পার্থক্য প্রায় মিলিয়ে যাওয়ায় মানুষ টের পাচ্ছে শীতের এক অস্বাভাবিক তীব্রতা। ঘন কুয়াশা, সূর্যের অনুপস্থিতি, বাতাসের স্থবিরতা আর তাপমাত্রার অস্বাভাবিক ওঠানামা—সব মিলিয়ে দেশের আবহাওয়া পরিস্থিতিকে ‘দুর্যোগপূর্ণ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৭৩ বছরের আবহাওয়ার ইতিহাসে এমন পরিস্থিতির নজির আর কখনো দেখা যায়নি।
কয়েক দিন ধরেই দেশের প্রায় সব অঞ্চলে দিন ও রাতের তাপমাত্রা প্রায় একই রকম থেকে যাচ্ছে। সাধারণত শীতকালে দিনের বেলায় সূর্যের উপস্থিতিতে তাপমাত্রা কিছুটা বাড়ে, আর রাতে তা কমে যায়। কিন্তু এবার সেই স্বাভাবিক ছন্দ ভেঙে গেছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দিনের বেলায়ও শীতের তীব্রতা কমছে না। ঘন কুয়াশার কারণে সূর্যের আলো দীর্ঘ সময় স্থায়ী হচ্ছে না, ফলে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বাড়ার সুযোগই পাচ্ছে না। এতে মানুষের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত হচ্ছে, বাড়ছে শীতজনিত ভোগান্তি।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৯ ডিসেম্বর রাজধানী ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ১৫ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৩ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ, ওই দিন দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য ছিল মাত্র ১ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা একেবারেই ব্যতিক্রমী। সিনিয়র আবহাওয়াবিদ ড. বজলুর রশিদ জানান, ওই দিনের মতো শীত ঢাকায় আগে কখনো অনুভূত হয়নি। তার ভাষায়, এরপর থেকে কয়েক দিন ধরে দেখা যাচ্ছে দিন ও রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ১২ থেকে ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কম থাকছে, যার ফলে শীতের তীব্রতা ক্রমেই বেড়ে চলেছে।
ড. বজলুর রশিদ বলেন, আবহাওয়া অধিদপ্তরের কাছে থাকা ৭৩ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করেও এমন পরিস্থিতির কোনো নজির পাওয়া যায়নি। সাধারণত শীতের মৌসুমে দু-তিন দিন ঘন কুয়াশা থাকার পর তা কেটে যায়। এত অল্প সময়ের জন্য কুয়াশা থাকলে মানুষ খুব একটা শীত অনুভব করে না। কিন্তু এবছর পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। দীর্ঘ সময় ধরে একই ধরনের আবহাওয়া বিরাজ করছে। দিনের পর দিন গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির মতো ঘন কুয়াশা পড়ছে, সূর্যের আলো খুব অল্প সময়ের জন্য দেখা দিচ্ছে। এতে দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য কমে যাচ্ছে এবং পরিবেশে এক ধরনের স্থায়ী শীতলতা তৈরি হচ্ছে, যা মানুষের শরীরে কুলিং ইফেক্ট বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতির আরেকটি দিক হলো দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের তাপমাত্রার অদলবদল। গতকাল সোমবার দেখা গেছে, দেশের সর্বদক্ষিণের এলাকা টেকনাফের চেয়ে উত্তরের তেঁতুলিয়ায় তাপমাত্রা বেশি ছিল। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, উত্তরের অঞ্চলে শীত বেশি হওয়ার কথা এবং দক্ষিণে তুলনামূলক উষ্ণতা থাকার কথা। কিন্তু এবছর সেই চিত্র উল্টো দেখা যাচ্ছে, যা আবহাওয়াবিদদের কাছেও বিস্ময়কর বলে মনে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দিল্লি থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত একটি দীর্ঘ ঘন কুয়াশার বলয় কয়েক দিন ধরেই পুরো অঞ্চলের ওপর চেপে বসে আছে। পাশাপাশি চলতি শীত মৌসুমে অন্যান্য বছরের মতো পশ্চিমা লঘুচাপ বা বৃষ্টি দেখা যাচ্ছে না। প্রায় দুই মাস ধরে উল্লেখযোগ্য কোনো বৃষ্টি হয়নি, বাতাসের গতিবেগও অত্যন্ত কম। এই সব কারণ মিলেই কুয়াশা সহজে কাটছে না এবং আবহাওয়ার উন্নতি কবে নাগাদ হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা এক ডিগ্রি সেলসিয়াস কমলেও রাজধানী ঢাকায় তাপমাত্রা এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আজ মঙ্গলবার ও আগামীকাল বুধবার তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে। তবে এই সাময়িক উষ্ণতার পর আবার তাপমাত্রা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ, শীত থেকে দ্রুত মুক্তি পাওয়ার কোনো আশ্বাস দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা।
গতকাল দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে পাবনার ঈশ্বরদীতে, যেখানে তাপমাত্রা নেমে আসে ৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এর আগের দিন মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বর্তমানে রাজশাহী বিভাগের আটটি জেলা ছাড়াও কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, যশোর ও দিনাজপুরে শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এসব অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রায় শীতের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে।
আবহাওয়াবিদ মো. তরিফুল নেওয়াজ কবীর জানিয়েছেন, তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় শৈত্যপ্রবাহের পরিধি কিছুটা বেড়েছে। তবে আগামী দুই দিন তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে। এরপর পরিস্থিতি আবার আগের মতো শীতল হয়ে উঠতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তার মতে, চলতি মাসে শীতের প্রকোপ আরও কয়েক দফায় ফিরে আসতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সংজ্ঞা অনুযায়ী, দেশের কোনো এলাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮ দশমিক ১ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে তাকে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়। তাপমাত্রা ৬ দশমিক ১ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে সেটি মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ এবং ৪ দশমিক ১ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ হিসেবে বিবেচিত হয়। আর তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেলে তাকে অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে কিছু অঞ্চলে তাপমাত্রা দ্রুত নিচের দিকে নামছে, যা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
আবহাওয়া দপ্তরের আশঙ্কা, এই অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে চলতি মাসেই দেশের কোথাও কোথাও তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে যেতে পারে। যদিও ২০১৮ সালের মতো ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামার আশঙ্কা নেই বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। তবুও শীতের তীব্রতা জনজীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চলতি জানুয়ারি মাসে দেশে অন্তত পাঁচ দফা শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এর মধ্যে এক থেকে দুটি দফা তীব্র শৈত্যপ্রবাহ হতে পারে। এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু, বয়স্ক মানুষ ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠী। শীতজনিত রোগের প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কাও করছেন চিকিৎসকেরা।
সব মিলিয়ে, ৭৩ বছরের মধ্যে নজিরবিহীন এই আবহাওয়া পরিস্থিতি দেশের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হয়ে এসেছে। প্রকৃতির এই অস্বাভাবিক আচরণ শুধু দৈনন্দিন জীবনযাত্রাই নয়, কৃষি, স্বাস্থ্য ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, শীত মোকাবিলায় ব্যক্তি ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বাড়তি সতর্কতা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।