জাপানের পশ্চিমাঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্প, আতঙ্কে জনজীবন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৯০ বার
জাপানের পশ্চিমাঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্প, আতঙ্কে জনজীবন

প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারী ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাপানের পশ্চিমাঞ্চলে মঙ্গলবার সকালে ৬ দশমিক ২ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এর পরপরই ৫ দশমিক ১ মাত্রার আরেকটি বড় ভূমিকম্প এবং একাধিক ছোট আফটারশকে কেঁপে ওঠে বিস্তীর্ণ এলাকা। হঠাৎ এই কম্পনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে। যদিও এখন পর্যন্ত সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়নি, তবুও ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ জাপানে এমন ধারাবাহিক কম্পন নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জাপান টাইমস জানায়, স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ১৮ মিনিটে প্রথম ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এর তীব্রতা ছিল রিখটার স্কেলে ৬ দশমিক ২। কম্পনের কয়েক মিনিটের মধ্যেই দ্বিতীয় দফায় ৫ দশমিক ১ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এরপর সকালজুড়ে আক্রান্ত অঞ্চলে একাধিক ছোট ছোট আফটারশক রেকর্ড করা হয়েছে, যা মানুষকে দীর্ঘ সময় ধরে আতঙ্কের মধ্যে রেখেছে।

জাপানের আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, ভূমিকম্পগুলোর কেন্দ্রস্থল ছিল শিমানে প্রিফেকচার এবং এর পার্শ্ববর্তী টোটোরি প্রিফেকচার এলাকায়। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে। তুলনামূলকভাবে অগভীর গভীরতার কারণে কম্পন ছিল বেশ শক্তিশালী এবং বিস্তৃত এলাকায় তা স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়।

প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, ভূমিকম্পে কয়েকজন মানুষ আহত হয়েছেন এবং কিছু ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে পুরোনো ভবন ও পাহাড়ি এলাকার বসতিগুলোতে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা বেশি বলে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে। অনেক মানুষ ভয়ে ঘর ছেড়ে খোলা জায়গায় বেরিয়ে আসেন। অফিস, দোকানপাট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাময়িকভাবে কাজকর্ম বন্ধ রাখা হয়।

জাপানের আবহাওয়া সংস্থা আরও জানিয়েছে, ভূমিকম্পের ফলে সুনামির কোনো শঙ্কা নেই। তবে তারা সতর্ক করে বলেছে, আগামী কয়েকদিন ৫ মাত্রার ওপরে আরও একাধিক ভূমিকম্প হতে পারে। বিশেষ করে সামনের দুই থেকে তিনদিন আফটারশকের ঝুঁকি বেশি। এ কারণে ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে বসবাসকারীদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

ভূমিকম্পের পর পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস এবং পাহাড় থেকে পাথর খসে পড়ার আশঙ্কার কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি। ইতোমধ্যে স্থানীয় প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি জোরদার করেছে। জরুরি পরিষেবাগুলোকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে যাতে পরিস্থিতি খারাপ হলে দ্রুত সহায়তা দেওয়া যায়।

দুটি আঞ্চলিক বিদ্যুৎ কোম্পানি জানিয়েছে, ভূমিকম্পের পর বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সরবরাহ ব্যবস্থায় তাৎক্ষণিক কোনো অস্বাভাবিকতা পাওয়া যায়নি। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে বলে তারা নিশ্চিত করেছে। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে বিভিন্ন স্থাপনা ও অবকাঠামো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এদিকে ভূমিকম্পের কারণে জাপানের উচ্চগতির বুলেট ট্রেন বা শিনকানসেন চলাচলে সাময়িক বিঘ্ন ঘটে। নিরাপত্তা যাচাইয়ের জন্য কিছু রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয় এবং কিছু ট্রেন বিলম্বিত হয়। যাত্রীদের মধ্যে কিছুটা ভোগান্তি দেখা দিলেও বড় ধরনের দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

বিভিন্ন ভবনে স্থাপিত সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে ভূমিকম্পের শক্তিশালী কম্পন ধরা পড়েছে। অনেক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে দেখা যায় ভবনের ভেতরে থাকা আসবাবপত্র কেঁপে উঠছে এবং মানুষজন আতঙ্কে দৌড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যাচ্ছে। এসব দৃশ্য আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, ভূমিকম্প জাপানের মানুষের নিত্যদিনের জীবনের অংশ হলেও শক্তিশালী কম্পন এখনো সমানভাবে ভীতিকর।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাপান বিশ্বের সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলোর একটি। এখানে প্রতিদিন অসংখ্য ক্ষুদ্র কম্পন ঘটে, যার অনেকটাই মানুষের অনুভূত হয় না। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটিতে গড়ে প্রতি পাঁচ মিনিটে একটি করে ভূমিকম্প হয়। তবে মাঝেমধ্যে বড় মাত্রার ভূমিকম্প জনজীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।

জাপান প্রশান্ত মহাসাগরের ‘রিং অব ফায়ার’-এর পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। এই অঞ্চলে পৃথিবীর চারটি বড় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থল রয়েছে। প্লেটগুলোর ক্রমাগত নড়াচড়ার কারণেই জাপানে ঘন ঘন ভূমিকম্প হয়। এই ভূ-প্রাকৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে জাপান ভূমিকম্প-প্রতিরোধী অবকাঠামো, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বিশ্বে অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে।

তারপরও ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়, বড় ভূমিকম্প কতটা ভয়াবহ হতে পারে। ২০১১ সালে জাপানে ৯ মাত্রার এক ভয়ংকর ভূমিকম্প ও সুনামি আঘাত হানে। সেই দুর্যোগে প্রায় ১৮ হাজার ৫০০ মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হন। একই সঙ্গে ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ঘটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা, যা জাপানের ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত হিসেবে আজও স্মরণীয়।

সাম্প্রতিক এই ভূমিকম্প তুলনামূলকভাবে কম মাত্রার হলেও বিশেষজ্ঞরা একে হালকাভাবে দেখছেন না। তারা বলছেন, বড় ভূমিকম্পের আগে অনেক সময় এমন ধারাবাহিক মাঝারি মাত্রার কম্পন দেখা যায়। যদিও প্রতিটি ভূমিকম্পই যে বড় দুর্যোগের পূর্বাভাস—এমন নয়, তবুও সতর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরি।

স্থানীয় প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলো জনগণকে অপ্রয়োজনে আতঙ্কিত না হয়ে নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় যাতায়াত এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে। স্কুল, হাসপাতাল এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে, জাপানের পশ্চিমাঞ্চলে এই ভূমিকম্প আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে দেশটির ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং দুর্যোগ প্রস্তুতির গুরুত্ব। প্রযুক্তি ও প্রস্তুতিতে যতই এগিয়ে থাকুক, প্রকৃতির শক্তির সামনে মানুষের সতর্কতা ও সচেতনতার বিকল্প নেই—এই বার্তাই যেন নতুন করে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com