ভিসা বন্ড তালিকা বাড়াল যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশের নাম যুক্ত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৭ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৮ বার
ভিসা বন্ড তালিকা বাড়াল যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশের নাম যুক্ত

প্রকাশ: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে অভিবাসন নীতিকে আরও কঠোর করার পথে বড় পদক্ষেপ নিল ট্রাম্প প্রশাসন। মার্কিন ভিসার জন্য আবেদনকারীদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত ‘ভিসা বন্ড’ বা জামানত নেওয়ার যে তালিকা আগে সীমিত কয়েকটি দেশের মধ্যে ছিল, তা এবার প্রায় তিন গুণ বাড়ানো হয়েছে। নতুন করে যুক্ত হওয়া দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশসহ আরও ২৫টি দেশ। এর ফলে ভিসা বন্ডের আওতাভুক্ত দেশের মোট সংখ্যা দাঁড়াল ৩৮টি, যা আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ও অভিবাসন প্রক্রিয়ায় নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ভ্রমণবিষয়ক ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সর্বশেষ সংযোজন করা দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য ভিসা বন্ডের শর্ত আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে। অর্থাৎ, ওই তারিখের পর বাংলাদেশসহ তালিকাভুক্ত দেশগুলোর নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের জন্য নির্দিষ্ট শর্তে ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এক সপ্তাহ আগে ভিসা বন্ডের শর্তযুক্ত দেশের তালিকায় সাতটি দেশ যুক্ত করা হয়েছিল। এর রেশ কাটতে না কাটতেই এবার আরও বড় পরিসরে তালিকা সম্প্রসারণ করা হলো। এতে বোঝা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের বিষয়ে প্রশাসনের অবস্থান ক্রমেই কঠোর হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির ধারাবাহিক অংশ, যেখানে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির আলোকে সীমান্ত ও অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে।

ভিসা বন্ড বলতে মূলত এমন একটি আর্থিক জামানতকে বোঝায়, যা নির্দিষ্ট কিছু দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে অস্থায়ী ভিসায় প্রবেশের সময় দিতে হয়। এই অর্থের উদ্দেশ্য হলো, ভিসার মেয়াদ শেষে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যেন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করেন—তা নিশ্চিত করা। যদি কেউ ভিসার শর্ত ভঙ্গ করেন বা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশ না ছাড়েন, তাহলে সেই বন্ডের অর্থ বাজেয়াপ্ত করার সুযোগ থাকে মার্কিন কর্তৃপক্ষের।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ডলার বন্ডের পরিমাণ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৮ লাখ ৩৫ হাজার টাকার সমান, প্রতি ডলার ১২২.৩১ টাকা হিসাবে। এই অঙ্কটি বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকদের জন্য অত্যন্ত বড়। ফলে পর্যটন, পারিবারিক সফর কিংবা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে আগ্রহীদের জন্য ভিসা প্রাপ্তির প্রক্রিয়া আরও ব্যয়বহুল ও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ৩৮টি দেশের বেশিরভাগই আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ। পাশাপাশি লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ার কয়েকটি দেশও রয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, এসব দেশের নাগরিকদের মধ্যে ভিসার শর্ত ভঙ্গ করে যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে থেকে যাওয়ার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। তাই ঝুঁকি কমাতেই ভিসা বন্ডের মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে মানবাধিকার ও অভিবাসন বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত বৈষম্যমূলক এবং এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর নাগরিকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

ভিসা বন্ডের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের জন্য আরও কিছু কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়েছে। নতুন নীতিমালার আওতায় ভিসার প্রয়োজন হয়—এমন দেশের নাগরিকদের বাধ্যতামূলকভাবে ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকারে অংশ নিতে হবে। একই সঙ্গে আবেদনকারীদের দীর্ঘ সময়ের সোশ্যাল মিডিয়া ইতিহাস প্রকাশ করতে হতে পারে। এর মধ্যে রাজনৈতিক মতামত, সামাজিক যোগাযোগের ধরন এবং অনলাইন কর্মকাণ্ডও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে বলে জানা গেছে।

এছাড়া আবেদনকারীদের নিজেদের এবং তাদের পরিবারের পূর্ববর্তী ভ্রমণের ইতিহাস, কোথায় ছিলেন, কীভাবে জীবনযাপন করেছেন—এসব বিষয়ের বিস্তারিত বিবরণ দিতে হবে। মার্কিন কর্তৃপক্ষের যুক্তি হলো, এসব তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে এবং অবৈধ অভিবাসনের ঝুঁকি কমানো যাবে। তবে সমালোচকদের মতে, এটি ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ এবং ভিসা প্রক্রিয়াকে অযথা জটিল করে তোলার শামিল।

বাংলাদেশের বড় দুশ্চিন্তা ব্যাটিং

বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী, পর্যটক, ব্যবসায়ী ও পারিবারিক ভিসা আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার চেষ্টা করেন। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগের কারণে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তরুণদের কাছে একটি জনপ্রিয় গন্তব্য। নতুন এই ভিসা বন্ড নীতির ফলে অনেকেই আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়তে পারেন বলে মনে করছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এত বড় অঙ্কের জামানত জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে।

কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও এটি সরাসরি ভ্রমণ ও অভিবাসন সংক্রান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, তবুও এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখনও জানা যায়নি, তবে কূটনৈতিক পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতি বৈশ্বিক অভিবাসন ব্যবস্থায় একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে। একদিকে যেমন এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের অংশ, অন্যদিকে এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য বৈধ ভ্রমণের পথকে আরও সংকুচিত করছে। ফলে ভবিষ্যতে অন্যান্য দেশও অনুরূপ কঠোর নীতি গ্রহণ করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।

সব মিলিয়ে, ভিসা বন্ড তালিকা সম্প্রসারণের এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রে যেতে ইচ্ছুক বাংলাদেশিদের জন্য নতুন এক বাস্তবতার সূচনা করল। আর্থিক সক্ষমতা, তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা এবং বাড়তি যাচাই—সবকিছু মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পথ আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভিসা আবেদনকারীদের আরও সতর্ক, প্রস্তুত ও সচেতন হতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত