মুসাফির অবস্থায় সুন্নত নামাজ: কী করবেন, কী নয়

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৭ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৮ বার
মুসাফির অবস্থায় সুন্নত নামাজ: কী করবেন, কী নয়

প্রকাশ: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের লাখো মানুষ জীবিকা, ব্যবসা ও নানা পেশাগত প্রয়োজনে প্রতিনিয়ত এক জেলা থেকে আরেক জেলায় সফর করছেন। আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা সফরকে সহজ করলেও ইবাদতের ক্ষেত্রে অনেকের মাঝেই দেখা দেয় দ্বিধা ও প্রশ্ন। বিশেষ করে নামাজের বিধান নিয়ে। চার রাকাত বিশিষ্ট ফরজ নামাজ সফর অবস্থায় কসর করে আদায় করা যে শরিয়তের নির্দেশ, তা অনেকেই জানেন। কিন্তু ফরজ নামাজের আগে ও পরে যে সুন্নত নামাজ রয়েছে, সফরকালে সেগুলোর করণীয় কী—এ প্রশ্নটি প্রায়ই উঠে আসে। চট্টগ্রামের হাটহাজারীর ব্যবসায়ী জামিল মাহমুদের প্রশ্নটিও সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।

ইসলামে নামাজ শুধু আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়, বরং বান্দা ও আল্লাহর মধ্যে সরাসরি সংযোগের অন্যতম মাধ্যম। শরিয়ত তাই মানুষের সক্ষমতা, সময় ও পরিস্থিতির প্রতি গভীরভাবে দৃষ্টি রেখেছে। সফর অবস্থাকে শরিয়তে একটি বিশেষ অবস্থা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, যেখানে কিছু বিধানে সহজীকরণ বা রুখসত দেওয়া হয়েছে। ফরজ নামাজ কসর করার অনুমতি তার অন্যতম দৃষ্টান্ত। ঠিক একইভাবে সুন্নত নামাজের ক্ষেত্রেও সফর অবস্থায় কিছুটা শিথিলতা লক্ষ্য করা যায়।

ফিকহবিদদের আলোচনায় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, সাধারণ অবস্থার তুলনায় সফর অবস্থায় সুন্নতের হুকুম হালকা বা নমনীয় হয়ে যায়। অর্থাৎ মুসাফির ব্যক্তি যদি চলমান অবস্থায় থাকেন, তাড়াহুড়া থাকে, সহযাত্রীদের অপেক্ষা করতে হয় কিংবা শারীরিক ক্লান্তি অনুভব করেন, তাহলে ফরজ নামাজের আগে ও পরে সুন্নত নামাজ ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এতে কোনো গুনাহ হবে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে সহযাত্রীদের কষ্ট না দেওয়া এবং সফরের শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য সুন্নত না পড়াই উত্তম বলে ফকিহগণ উল্লেখ করেছেন।

তবে এই শিথিলতার অর্থ এই নয় যে সফর অবস্থায় সুন্নত নামাজের গুরুত্ব পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়। শরিয়তের দৃষ্টিতে মূলনীতি হলো, সক্ষমতা ও সুযোগ থাকলে নফল ও সুন্নত ইবাদত আদায় করা সওয়াবের কাজ। তাই মুসাফির যদি কোনো জায়গায় পৌঁছে অবস্থান করেন, যেমন হোটেল, আত্মীয়ের বাড়ি বা ব্যবসায়িক গন্তব্যে, এবং সেখানে স্থিরভাবে থাকার সুযোগ থাকে, শরীর সুস্থ থাকে, অতিরিক্ত ক্লান্তি বা সময়ের চাপ না থাকে, তাহলে যথাসম্ভব সুন্নতে মুআক্কাদা আদায় করে নেওয়াই উত্তম।

এ ক্ষেত্রে হানাফি ফিকহের গ্রন্থগুলোতে একটি সুন্দর ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়া যায়। ইমাম আবু জাফর রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, সফরে নামাজের সুন্নত আদায়ের ব্যাপারে অবস্থা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়াই উত্তম। সফর চলমান থাকলে ছেড়ে দেওয়া রুখসত হিসেবে গ্রহণযোগ্য, আর কোথাও নেমে স্থির হলে আদায় করাই আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম। আল-মুহীতুল বুরহানি ও আত-তাজনিস ওয়াল মাজিদসহ বহু ফিকহি কিতাবে এ বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া যায়।

তবে ফজরের সুন্নতের বিষয়টি অন্য সব সুন্নত থেকে ব্যতিক্রম। এ বিষয়ে হাদিস শরিফে অত্যন্ত জোরালো নির্দেশনা এসেছে। হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুস্থ অবস্থায় হোক বা অসুস্থতায়, সফরে হোক বা আবাসে—কখনোই ফজরের আগের দুই রাকাত সুন্নত ছাড়তেন না। এই বর্ণনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, ফজরের সুন্নত নামাজের গুরুত্ব এত বেশি যে সফর অবস্থাতেও তা যথাসম্ভব আদায় করা উচিত।

ফিকহবিদদের মতে, ফজরের সুন্নত হলো এমন একটি ইবাদত, যা ওয়াজিবের কাছাকাছি গুরুত্ব বহন করে। তাই বিশেষ কোনো বড় সমস্যার আশঙ্কা না থাকলে, যেমন সময় একেবারেই না থাকা বা নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি, সেক্ষেত্রে ফজরের সুন্নত ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। অন্যান্য সুন্নতের ক্ষেত্রে যে শিথিলতা রয়েছে, ফজরের সুন্নতের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়।

এই প্রসঙ্গে আল-মাবসূত, খুলাসাতুল ফাতাওয়া, শরহুল মুনইয়া ও আদ্দুররুল মুখতারসহ প্রামাণ্য ফিকহি গ্রন্থগুলোতে একই ধরনের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে, মুসাফির যদি নিরাপদ ও স্থির অবস্থায় থাকেন, তাহলে সুন্নত আদায় করাই উত্তম ও পছন্দনীয়। আর যদি চলমান অবস্থায় থাকেন, তাহলে ছেড়ে দেওয়াও বৈধ।

 

এই আলোচনার মানবিক দিকটি হলো, ইসলাম কখনোই বান্দার ওপর অসহনীয় বোঝা চপিয়ে দেয় না। সফর মানুষের জন্য কষ্টকর হতে পারে—দীর্ঘ পথ, যানজট, দুশ্চিন্তা, শারীরিক ক্লান্তি সবকিছু মিলিয়ে। তাই আল্লাহ তাআলা শরিয়তের বিধানে এমন সহজীকরণ রেখেছেন, যাতে বান্দা ইবাদত থেকে বিমুখ না হয়ে বরং স্বস্তির সঙ্গে তা পালন করতে পারে। একই সঙ্গে সুযোগ ও সামর্থ্য থাকলে ইবাদতের সৌন্দর্য ও পূর্ণতা অর্জনের পথও খোলা রেখেছেন।

সুতরাং ব্যবসায়ী হোক বা চাকরিজীবী, যিনি নিয়মিত সফর করেন, তাঁর জন্য মূল কথা হলো নিজের অবস্থা বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া। ফরজ নামাজ কসর করা যেমন জরুরি, তেমনি সুন্নতের ব্যাপারে শরিয়তের দেওয়া ছাড় ও ফজিলত—দুটোই মাথায় রাখা প্রয়োজন। চলার পথে তাড়াহুড়ো হলে সুন্নত ছেড়ে দেওয়া কোনো অপরাধ নয়। আবার স্থির অবস্থায় থাকলে তা আদায় করে নেওয়া আল্লাহর নৈকট্য লাভের একটি সুন্দর সুযোগ।

শেষ কথা হলো, সফর অবস্থায় নামাজ ইসলামের সহজ ও বাস্তবমুখী বিধানের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এখানে বাধ্যবাধকতার পাশাপাশি রয়েছে করুণা ও মানবিকতা। সেই ভারসাম্য রক্ষা করেই একজন মুমিন তার ইবাদতের জীবনকে সুন্দর ও অর্থবহ করে তুলতে পারেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত