শুল্ক ও তেল বাণিজ্যে চাপ, ট্রাম্পের মুখে মোদি-বার্তা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৭ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৭৯ বার
শুল্ক ও তেল বাণিজ্যে চাপ, ট্রাম্পের মুখে মোদি-বার্তা

প্রকাশ: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সম্পর্ক নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি, রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি এবং প্রতিরক্ষা বাণিজ্য—এই তিনটি ইস্যু একসূত্রে বেঁধে সম্প্রতি রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্যদের এক সম্মেলনে বক্তব্য দেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি দাবি করেন, উচ্চ শুল্ক আরোপের কারণে প্রধানমন্ত্রী মোদি তার ওপর খুশি নন, তবে একই সঙ্গে মোদি তার সঙ্গে দেখা করতে আগ্রহী ছিলেন বলেও উল্লেখ করেন। ট্রাম্পের ভাষায়, মোদি নাকি তাকে বলেছেন, ‘স্যার, আমি কি আপনার সঙ্গে দেখা করতে পারি?’

এই বক্তব্য সামনে আসার পর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক বরাবরই বহুমাত্রিক—বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, কৌশলগত অংশীদারত্ব এবং ভূরাজনীতির নানা সমীকরণে গাঁথা। ট্রাম্পের বক্তব্য সেই সম্পর্কের ভেতরের চাপ ও দরকষাকষির বাস্তব চিত্রই তুলে ধরেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্যদের সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ভারতের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক খুবই ভালো। তিনি প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ‘ভালো মানুষ’ হিসেবেও উল্লেখ করেন। তবে একই সঙ্গে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর উচ্চ হারে শুল্ক আরোপ করায় মোদি সন্তুষ্ট নন। ট্রাম্পের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই শুল্কনীতি দেশটিকে আরও ধনী করে তুলছে। তিনি বলেন, “শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্র আরও ধনী হয়ে যাচ্ছে।”

ট্রাম্প তার বক্তব্যে উদাহরণ হিসেবে ভারতের সামরিক ক্রয়াদেশের কথাও তুলে ধরেন। তিনি জানান, ভারত ৬৮টি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার অর্ডার করেছে। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী মোদি তার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন এবং এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেছেন। ট্রাম্পের দাবি, ভারত দীর্ঘদিন ধরে এই হেলিকপ্টারগুলোর জন্য অপেক্ষা করছিল এবং এখন বিষয়টি এগিয়ে চলেছে।

বাণিজ্যিক চাপের পাশাপাশি জ্বালানি রাজনীতিও উঠে আসে ট্রাম্পের বক্তব্যে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর শুল্ক বাড়াতে পারে—এ বিষয়টি মোদি জানতেন। ট্রাম্পের ভাষায়, “আমাকে খুশি করা গুরুত্বপূর্ণ।” তিনি আরও বলেন, ভারত এখন রাশিয়া থেকে তেল কেনার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি সরাসরি ইউক্রেন যুদ্ধ-পরবর্তী বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। পশ্চিমা দেশগুলোর চাপের মুখে ভারত রাশিয়ার তেল কেনা কমাচ্ছে—এমন বার্তা দিয়ে ট্রাম্প মূলত যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রভাবের কথাই তুলে ধরতে চেয়েছেন।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে তুলনামূলক কম দামে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল কিনে আসছে। এতে পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যেই একাধিকবার ভারতকে সতর্ক করেছে। ট্রাম্পের বক্তব্যে সেই চাপের প্রতিফলন স্পষ্ট। তিনি বলেন, মোদি জানতেন যে তিনি খুশি নন, এবং সে কারণেই ভারত তেল কেনার হার কমিয়েছে।

ট্রাম্প আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য করতে হলে ভারতের মতো দেশগুলোকেও শুল্কের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র খুব দ্রুতই প্রয়োজনে শুল্ক বাড়াতে পারে। এই বক্তব্যকে অনেকেই চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে দেখছেন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের সময় থেকেই শুল্ককে একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

প্রতিরক্ষা খাতেও যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্পর্ক দিন দিন ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। ট্রাম্প তার বক্তব্যে বলেন, ভারত বছরের পর বছর ধরে অ্যাপাচি হেলিকপ্টারের জন্য অপেক্ষা করেছে। এখন বিষয়টি বাস্তবায়নের পথে। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র এই পরিস্থিতির পরিবর্তন করছে। ৬৮টি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ক্রয়ের বিষয়টি ভারতীয় সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্যও বড় সাফল্য।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের বক্তব্যের ভেতরে একদিকে যেমন বন্ধুত্বের বার্তা আছে, অন্যদিকে তেমনি রয়েছে স্পষ্ট চাপ ও দরকষাকষির ভাষা। ‘মোদি ভালো মানুষ’ বলা হলেও শুল্ক, তেল ও বাণিজ্য নিয়ে তাকে খুশি করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে ট্রাম্প মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রাধান্যই প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন।

ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতির বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে পারস্পরিক স্বার্থের পাশাপাশি চাপ ও সমঝোতা—দুটিই সমানভাবে কাজ করছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার, অন্যদিকে শুল্ক ও জ্বালানি ইস্যুতে ভারতকে ছাড় দিতে হচ্ছে।

ট্রাম্পের বক্তব্যে ব্যবহৃত ভাষা নিয়েও আলোচনা চলছে। একজন রাষ্ট্রপ্রধানের মুখে ‘স্যার, আমি কি আপনার সঙ্গে দেখা করতে পারি’—এই উদ্ধৃতি কূটনৈতিক শিষ্টাচারের বাইরে বলেই মনে করছেন অনেকে। তবে ট্রাম্প বরাবরই এমন বক্তব্যের জন্য পরিচিত। তিনি প্রায়ই আন্তর্জাতিক নেতাদের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক ব্যক্তিগত রঙে তুলে ধরেন।

এই মন্তব্যের পর ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে কূটনৈতিক মহলে ধারণা করা হচ্ছে, বিষয়টি দিল্লি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক ভারতের বৈদেশিক নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সব মিলিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য আবারও প্রমাণ করল, যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক কেবল বন্ধুত্বের নয়, বরং কৌশল, চাপ ও স্বার্থের জটিল সমীকরণে আবদ্ধ। শুল্ক, তেল আমদানি ও সামরিক ক্রয়—এই তিন ইস্যু সামনে রেখে ট্রাম্প যে বার্তা দিয়েছেন, তা শুধু মোদির জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরারই একটি প্রচেষ্টা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত