মালয়েশিয়ায় বড় অভিযানে ২৬ বাংলাদেশিসহ ৭৭ অভিবাসী আটক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৬ বার
মালয়েশিয়ায় বড় অভিযানে ২৬ বাংলাদেশিসহ ৭৭ অভিবাসী আটক

প্রকাশ:  ০৮ জানুয়ারি ২০২৬। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মালয়েশিয়ায় অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে চলমান কঠোর অভিযানের অংশ হিসেবে নেগেরি সেম্বিলান রাজ্যে পরিচালিত এক বিশেষ অভিযানে ২৬ বাংলাদেশিসহ মোট ৭৭ জন অভিবাসীকে আটক করেছে দেশটির ইমিগ্রেশন বিভাগ। রাজ্যের সেরেমবান ও নিলাই এলাকার একাধিক স্থানে একযোগে পরিচালিত এই অভিযানে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের আটক করা হয়, যাদের বিরুদ্ধে বৈধ ভ্রমণ নথি না থাকা, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবস্থান করা এবং অন্যান্য অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে।

ইমিগ্রেশন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) সকাল ৯টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে এ অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানের সময় মোট ৩৯৫ জন বিদেশিকে যাচাই-বাছাই করা হয়। এর মধ্য থেকে ১৯ থেকে ৪৭ বছর বয়সি ৭৭ জনকে আটক করা হয়, যাদের মধ্যে ৭১ জন পুরুষ এবং ছয়জন নারী। পুরো অভিযানটি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয় এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে কেউ পালিয়ে যেতে পারেনি বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

নেগেরি সেম্বিলানের ইমিগ্রেশন বিভাগের পরিচালক কেনিথ তান আই কিয়াং অভিযানের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানিয়ে বলেন, জনসাধারণের কাছ থেকে পাওয়া অভিযোগ এবং এক সপ্তাহের গোয়েন্দা নজরদারির ভিত্তিতে এই বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। তিনি জানান, আটককৃতদের মধ্যে বাংলাদেশের ২৬ জন পুরুষ নাগরিক রয়েছেন, যা সংখ্যার দিক থেকে সর্বাধিক। এছাড়া ভারতের ২৬ জন পুরুষ, পাকিস্তানের ১০ জন পুরুষ, থাইল্যান্ডের পাঁচজন পুরুষ ও একজন নারী, মিয়ানমারের তিনজন পুরুষ ও দুইজন নারী এবং ইন্দোনেশিয়ার তিনজন নারী ও একজন পুরুষকে আটক করা হয়েছে।

অভিযানের সময় নিলাই এলাকায় অবস্থিত একটি সাবান উৎপাদন কারখানা থেকে এককভাবে সর্বাধিক ৫৫ জন অবৈধ অভিবাসীকে আটক করা হয়। কারখানাটিতে কর্মরত এসব অভিবাসীর অধিকাংশেরই বৈধ কাজের অনুমতি বা বৈধ পাসপোর্ট ছিল না বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। বিষয়টি মালয়েশিয়ায় অবৈধ শ্রমিক নিয়োগের পুরনো সমস্যাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

ইমিগ্রেশন বিভাগের পরিচালক জানান, আটককৃতদের বিরুদ্ধে মালয়েশিয়ার অভিবাসন আইন ১৯৫৯/৬৩, পাসপোর্ট আইন ১৯৬৬ এবং অভিবাসন বিধিমালা ১৯৬৩-এর আওতায় অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব আইনের অধীনে বৈধ ভ্রমণ নথি ছাড়া অবস্থান, ভিসার শর্ত লঙ্ঘন এবং অবৈধভাবে কাজ করার মতো অপরাধ গুরুতর হিসেবে বিবেচিত হয়। তদন্ত শেষে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

আটক সবাইকে পরবর্তী তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার জন্য নেগেরি সেম্বিলানের লেংগেং ইমিগ্রেশন ডিপোতে পাঠানো হয়েছে। সেখানে তাদের পরিচয়, নথিপত্র এবং মালয়েশিয়ায় প্রবেশ ও অবস্থানের ইতিহাস যাচাই করা হবে। তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে তাদের জরিমানা, কারাদণ্ড বা নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর মতো শাস্তি হতে পারে।

এই অভিযানের মাধ্যমে মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন বিভাগ আবারও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, অবৈধ অভিবাসন ও অননুমোদিত শ্রমিক নিয়োগের বিরুদ্ধে তারা কোনো ছাড় দেবে না। কেনিথ তান আই কিয়াং সতর্ক করে বলেন, যারা অবৈধ অভিবাসীদের নিয়োগ দেন বা আশ্রয় প্রদান করেন, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট নিয়োগকর্তা বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করা হবে।

মালয়েশিয়ায় বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক বৈধভাবে কাজ করলেও একটি অংশ বিভিন্ন কারণে অবৈধ অবস্থায় পড়ে যাচ্ছেন। কখনো দালালচক্রের প্রতারণা, কখনো কাজ হারিয়ে ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া, আবার কখনো অতিরিক্ত আয়ের আশায় নিয়ম ভেঙে অন্যখাতে কাজ করার ফলে তারা আইনগত জটিলতায় পড়ছেন। এবারের অভিযানে ২৬ বাংলাদেশি আটক হওয়ার ঘটনায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অবৈধ অভিবাসনের পেছনে শুধু আইন অমান্য করার বিষয়টি নয়, বরং অর্থনৈতিক চাপ, পরিবারকে সহায়তা করার তাগিদ এবং কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতাও বড় ভূমিকা রাখে। তবে একই সঙ্গে তারা জোর দিয়ে বলছেন, যেকোনো দেশে বসবাস ও কাজ করার ক্ষেত্রে সে দেশের আইন মেনে চলা অপরিহার্য, কারণ আইন লঙ্ঘনের ফলাফল শেষ পর্যন্ত অভিবাসীদের জীবনকেই আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।

ইমিগ্রেশন বিভাগ জনগণের সহযোগিতার কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে। অবৈধ অভিবাসী সংক্রান্ত যেকোনো তথ্য বা অভিযোগ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে সাধারণ জনগণকে আহ্বান জানানো হয়েছে। কর্মকর্তারা মনে করছেন, জনসাধারণের সচেতনতা ও সহযোগিতা ছাড়া অবৈধ অভিবাসন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

এই অভিযান আবারও প্রমাণ করেছে যে মালয়েশিয়া সরকার অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান আরও শক্ত করছে। একদিকে আইন প্রয়োগের কঠোরতা বাড়ছে, অন্যদিকে মানবিক বিবেচনায় বৈধ অভিবাসনের পথকে সহজ ও স্বচ্ছ করার বিষয়েও আলোচনা চলছে। এমন প্রেক্ষাপটে প্রবাসী বাংলাদেশিসহ সব বিদেশি শ্রমিকদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও টেকসই পথ হলো বৈধ কাগজপত্রের মাধ্যমে কাজ করা এবং নিয়মিত ভিসা ও কাজের অনুমতি হালনাগাদ রাখা।

মালয়েশিয়ায় আটক হওয়া ২৬ বাংলাদেশির ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে চলমান তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার ওপর। পরিবার থেকে দূরে থাকা এসব মানুষের জন্য সময়টি নিঃসন্দেহে মানসিক চাপের। এই ঘটনার মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য একটি সতর্কবার্তাও উঠে আসে—বিদেশে জীবিকার সন্ধানে গিয়ে আইন মেনে চলাই নিরাপদ ও সম্মানজনক ভবিষ্যতের একমাত্র পথ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত