প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
অ্যাশেজ মানেই ঐতিহ্য, উত্তাপ আর মর্যাদার লড়াই। সেই ঐতিহাসিক দ্বৈরথের ২০২৫–২৬ মৌসুমের অধ্যায়টি শেষ হলো অস্ট্রেলিয়ার একচেটিয়া আধিপত্যে। সিরিজ শুরুর মতো শেষটাও রাঙালো দাপুটে জয়ে। সিডনিতে সিরিজের পঞ্চম ও শেষ টেস্টে সফরকারী ইংল্যান্ডকে ৫ উইকেটে হারিয়ে ৪-১ ব্যবধানে অ্যাশেজ নিজেদের করে নিল অস্ট্রেলিয়া। এই জয় শুধু একটি ম্যাচ জয়ের গল্প নয়, বরং পুরো সিরিজজুড়ে অস্ট্রেলিয়ার কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব, মানসিক দৃঢ়তা ও ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের প্রতিচ্ছবি।
সিডনি টেস্টের ফল কার্যত চতুর্থ দিনেই নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। শেষ দিনে ইংল্যান্ডের সামনে যে লড়াই অপেক্ষা করছিল, তা ছিল মূলত সিরিজের মান বাঁচানোর। পঞ্চম দিনের সকালে ৮ উইকেটে ৩০২ রান নিয়ে ব্যাট করতে নামে ইংলিশরা। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের নিয়ন্ত্রিত আক্রমণের সামনে তারা আর বেশিদূর যেতে পারেনি। মাত্র ৪০ রান যোগ করেই অলআউট হয় ইংল্যান্ড। দ্বিতীয় ইনিংসে তাদের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৩৪২ রান, যা অস্ট্রেলিয়ার সামনে ১৬০ রানের তুলনামূলক সহজ লক্ষ্য ছুড়ে দেয়।
এর আগে ম্যাচের প্রথম ইনিংসে ইংল্যান্ড করেছিল ৩৮৪ রান। সেই ইনিংসেও কিছুটা প্রতিরোধ গড়েছিল তারা, কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার জবাব ছিল আরও শক্তিশালী। স্বাগতিকরা প্রথম ইনিংসে ৫৪২ রান করে বিশাল লিড গড়ে তোলে, যা ম্যাচের গতিপথ পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। এই লিডই শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।
ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় ইনিংসে একমাত্র উজ্জ্বল ব্যতিক্রম ছিলেন জ্যাকব বেথেল। চাপের মুখেও দায়িত্বশীল ব্যাটিং করে তিনি ১৫৪ রান করেন। তরুণ এই ব্যাটারের ইনিংস ইংলিশ শিবিরে কিছুটা স্বস্তি এনে দিলেও দলকে রক্ষা করার জন্য তা যথেষ্ট ছিল না। হ্যারি ব্রুক ও বেন ডাকেট ৪২ রান করে কিছুটা লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিলেও সেটি স্থায়ী হয়নি। জেমি স্মিথের ২৬ রানও পরাজয়ের চিত্র বদলাতে পারেনি। অস্ট্রেলিয়ান বোলাররা নিয়মিত বিরতিতে উইকেট তুলে নিয়ে ইংল্যান্ডের আশা নিভিয়ে দেন।
১৬০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে অস্ট্রেলিয়া শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক মেজাজে ছিল। ট্রাভিস হেড ও জেক ওয়েদারাল্ড দেখিয়ে দেন, তারা এই ম্যাচ দীর্ঘায়িত করতে চান না। মাত্র ৬৩ বলে ৬২ রানের উদ্বোধনী জুটি গড়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ দ্রুত নিজেদের দিকে টেনে নেন তারা। হেড ৩৫ বলে ২৯ রান করে জশ টাংয়ের বলে বিদায় নিলেও তার আগ্রাসী মানসিকতা দলের জয়ের ভিত গড়ে দেয়। ওয়েদারাল্ডও থেমে থাকেননি, ৪০ বলে ৩৪ রান করে আউট হলেও লক্ষ্য তাড়ায় প্রয়োজনীয় গতি এনে দেন।
এরপর মারনাস লাবুশেন দায়িত্ব নিয়ে খেলেন। ৪০ বলে ৩৭ রান করে তিনি ইনিংস এগিয়ে নেন, যদিও রানআউট হয়ে ফিরে যেতে হয় তাকে। অধিনায়ক স্টিভ স্মিথ মাত্র ১২ রান করেই উইল জ্যাকসের বলে বোল্ড হন, যা কিছুটা নাটক তৈরি করলেও ম্যাচের ফল নিয়ে বড় কোনো সংশয় তৈরি হয়নি। ক্যারিয়ারের শেষ টেস্ট ইনিংস খেলতে নামা উসমান খাজাও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি, ৭ বলে ৬ রান করে জশ টাংয়ের শিকার হন তিনি। তবু এই আউটগুলো অস্ট্রেলিয়ার আত্মবিশ্বাসে বড় কোনো চিড় ধরাতে পারেনি।
শেষ পর্যন্ত অ্যালেক্স ক্যারি ও ক্যামেরন গ্রিনের দৃঢ় জুটিতে জয় নিশ্চিত হয় অস্ট্রেলিয়ার। ৪০ রানের এই অবিচ্ছিন্ন জুটি ম্যাচের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে। ক্যারি ২৭ বলে ১৬ রান করেন, গ্রিন ২৭ বলে ২২ রান করে অপরাজিত থাকেন। পাঁচ উইকেটের জয় নিয়ে সিরিজ শেষ করে অস্ট্রেলিয়া, আর সিডনির দর্শকরা সাক্ষী থাকেন আরেকটি স্মরণীয় অ্যাশেজ সমাপ্তির।
এই টেস্টে ম্যাচসেরার পুরস্কার উঠেছে ট্রাভিস হেডের হাতে। প্রথম ইনিংসে তার ১৬৬ বলে ১৬৩ রানের দাপুটে ইনিংসই মূলত ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। আক্রমণাত্মক ব্যাটিং, নিখুঁত শট নির্বাচন আর চাপের মুখেও রান তোলার ক্ষমতা—সব মিলিয়ে হেড ছিলেন ইংল্যান্ডের জন্য এক দুঃস্বপ্ন। সিরিজজুড়েও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, যদিও সিরিজ সেরার পুরস্কার গেছে আরেক তারকার ঝুলিতে।
পুরো অ্যাশেজ সিরিজের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন মিচেল স্টার্ক। পাঁচ ম্যাচে ৪৬ উইকেট শিকার করে তিনি ইংল্যান্ডের ব্যাটিং লাইনআপকে বারবার ভেঙে দিয়েছেন। শুধু বল হাতে নয়, ব্যাট হাতেও ২০২ রান করে তিনি দলের ভারসাম্যে বড় ভূমিকা রাখেন। স্টার্কের গতি, সুইং ও আগ্রাসন ইংলিশ ব্যাটারদের জন্য ছিল ধারাবাহিক পরীক্ষা, যেখানে বেশিরভাগ সময়ই তারা ব্যর্থ হয়েছেন।
এই সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার সাফল্যের পেছনে ছিল দলগত সমন্বয় ও কৌশলগত স্পষ্টতা। বোলিং আক্রমণে ধারাবাহিকতা, ব্যাটিংয়ে গভীরতা আর ফিল্ডিংয়ে তীক্ষ্ণতা—সব মিলিয়ে তারা ইংল্যান্ডের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে ছিল। অন্যদিকে ইংল্যান্ড মাঝে মাঝে লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিলেও ধারাবাহিকতার অভাব তাদের বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
অ্যাশেজের এই অধ্যায় শেষ হলেও এর রেশ থাকবে অনেকদিন। অস্ট্রেলিয়া আবারও প্রমাণ করল, নিজেদের মাটিতে তারা কতটা শক্তিশালী। ইংল্যান্ডের জন্য এটি আত্মসমালোচনার সিরিজ, আর অস্ট্রেলিয়ার জন্য আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর উপলক্ষ। ক্রিকেট বিশ্ব এখন তাকিয়ে থাকবে, এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আগামী অ্যাশেজে কীভাবে নতুন গল্প লেখে।