প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও বৈশ্বিক অবস্থানকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের পর এবার তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে একযোগে ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন। বুধবার হোয়াইট হাউসে স্বাক্ষরিত এক স্মারকের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। হোয়াইট হাউসের দাবি, সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো আর যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ, কৌশলগত লক্ষ্য ও অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়, হোয়াইট হাউস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানায়, এই প্রত্যাহারের তালিকায় জাতিসংঘ-সম্পৃক্ত ৩১টি সংস্থা এবং জাতিসংঘের বাইরে আরও ৩৫টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তবে কোন কোন সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে দাঁড়াবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো নাম প্রকাশ করা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে, বিশেষ করে জাতিসংঘব্যবস্থা ও বহুপাক্ষিক কূটনীতির ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে।
হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে বলা হয়, গত কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ অর্থ, জনবল ও কূটনৈতিক শক্তি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এসব সংস্থার কার্যক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশিত প্রভাব কমেছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই দেশটির স্বার্থ উপেক্ষিত হয়েছে। প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সংস্থাগুলোর কিছু নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতি ও সার্বভৌম সিদ্ধান্তের ওপর অযাচিত চাপ সৃষ্টি করছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত তার দীর্ঘদিনের “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতিরই ধারাবাহিকতা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, প্যারিস জলবায়ু চুক্তি এবং একাধিক আন্তর্জাতিক চুক্তি ও কাঠামো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার বা স্থগিত করেছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদে এসে সেই প্রবণতা আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করেছে। এবার একসঙ্গে ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে সরে আসার ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে এক বড় ধরনের মোড় বলেই বিবেচিত হচ্ছে।
এই সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে হোয়াইট হাউস বলেছে, অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমলাতান্ত্রিক ও অকার্যকর হয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের অর্থ সেখানে ব্যয় হলেও প্রত্যাশিত ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না। বরং কিছু সংস্থা এমন নীতি ও অবস্থান গ্রহণ করছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও বৈশ্বিক নেতৃত্বের পরিপন্থী। প্রশাসনের মতে, এসব সংস্থা থেকে বেরিয়ে এসে যুক্তরাষ্ট্র তার সম্পদ আরও কার্যকরভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন ও দ্বিপক্ষীয় কূটনীতিতে ব্যবহার করতে পারবে।
তবে এই সিদ্ধান্তের সমালোচনাও কম নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই বিরোধী ডেমোক্র্যাট রাজনীতিকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে সরে আসা যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বমঞ্চে একঘরে করে তুলতে পারে। তাদের মতে, বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলো শুধু অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিক স্বার্থের ক্ষেত্র নয়, বরং বৈশ্বিক শান্তি, মানবাধিকার, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সমন্বিত উদ্যোগের প্ল্যাটফর্ম। সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে গেলে বিশ্বে তার নেতৃত্বের জায়গা দুর্বল হবে এবং সেই শূন্যতা পূরণে অন্য শক্তিধর রাষ্ট্র এগিয়ে আসতে পারে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরাও বিষয়টিকে গভীর গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। অনেকের মতে, জাতিসংঘ-সংশ্লিষ্ট ৩১টি সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহার হলে বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই এসব সংস্থার অন্যতম প্রধান অর্থদাতা ও প্রভাবশালী সদস্য। তাদের অনুপস্থিতি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর বাজেট, কার্যক্রম ও রাজনৈতিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই ঘোষণার প্রতিক্রিয়া ইতোমধ্যে আসতে শুরু করেছে। ইউরোপীয় কূটনৈতিক মহলের কেউ কেউ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ধারণাকে দুর্বল করতে পারে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, এটি হয়তো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে নিজেদের কাঠামো ও কার্যকারিতা পুনর্বিবেচনার সুযোগ দেবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা উন্নয়ন সহায়তা, মানবিক ত্রাণ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার বড় উৎস।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই সিদ্ধান্ত বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ট্রাম্প সমর্থকরা এটিকে সাহসী ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এতদিন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভার বহন করেছে, অথচ বিনিময়ে খুব কমই পেয়েছে। অন্যদিকে সমালোচকরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রভাব ও নরম শক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, প্রত্যাহার প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তি ও আইনি কাঠামো পর্যালোচনা করেই চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কিছু ক্ষেত্রে কংগ্রেসের অনুমোদন বা বাজেট সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। ফলে পুরো প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে সময় লাগতে পারে।
সব মিলিয়ে, ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহারের এই ঘোষণা শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি বিশ্ব রাজনীতির গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে এমন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। বহুপাক্ষিকতা বনাম একক জাতীয় স্বার্থ—এই পুরোনো বিতর্ক আবারও নতুন করে সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই পথচলা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে কোথায় নিয়ে যাবে, তা সময়ই বলে দেবে।